Header Ads

Header ADS

কেনো ভারতীয় হিন্দু জাতীয়বাদীরা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বোমা হামলার সমর্থন দিচ্ছে?

 


দীর্ঘদিন যাবত পূর্ব জেরুজালেমকে অবৈধভাবে দখল এবং গাজায় ক্রমাগত বোমা-হামলার জন্য ইসরায়েল বিশ্ববাসীর নিকট প্রচণ্ড নিন্দা ও সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের (যেমনঃ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা) মত এই সমালোচনার স্রোতের বিপক্ষে গিয়ে ইসরায়েলের এই দখলদারিত্ব ও বোমা হামলার পক্ষে সমর্থন প্রদান করতে দেখা গেছে ধর্ম-নিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র ভারতকে। এমনকি ভারতের মোদী সরকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করে ফিলিস্তিন বিরোধী নীতি গ্রহণ করছে এবং দেশব্যাপী তার প্রচারণাও চালাচ্ছে। 

সাম্প্রতিক গাজায় ইসরায়েলর বোমা হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬১ শিশু সহ প্রায় ২২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি অধিবাসী নিহত হয়েছেন এবং হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। পাশাপাশি, পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ঘর-বাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদ করায় প্রায় ১৫ জন ফিলিস্তানিকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে, গাজায় বোমা হামলার প্রতিবাদ হিসেবে হামাসের ছোড়া মিসাইলের আঘাতে প্রায় ১০ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হন। 

যেখানে বিশ্ববাসী ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে মিছিল, অবরোধ এবং সামাজিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন সমর্থনমূলক হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ইসরায়েলের আক্রমণ বিরোধী মতামত অর্জনে ব্যস্ত, ঠিক সেখানে ভারতের চেহারা একদম উলটো। ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), সোসাল মিডিয়ায় ইসরাইলের পক্ষে থাকার জন্য অসংখ্য হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে। যেমনঃ #ISupportIsrael, #IndiaWithIsrael, #IndiaStandsWithIsrael, #IsraelUnderFire ইত্যাদি। এমনকি ভারতীয় সামাজিক গণমাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহে অনেক হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ফিলিস্তিনিদের “সন্ত্রাস” অভিধানে যুক্ত করছে এবং ফিলিস্তিনি সন্ত্রাস দমনে ইসরাইলের পক্ষে থাকার জন্য দেশব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছে। গত শনিবার রাত হতে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা টুইটারে #PalestineTerrorist এই হ্যাশট্যাগটা বারংবার সংযুক্ত করছে, এমনকি অন্য সকল ইসরায়েলকে সমর্থিত হ্যাশট্যাগের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে এই ট্যাগটি। 

ইসরায়েলেরপ্রতি ভারতের যে ব্যপক সমর্থন তা বেশি লক্ষিত হচ্ছে সোসাল মিডিয়ায়, বিশেষত টুইটার ও ইনস্ট্রাগ্রামে, এবং এই সমর্থনের ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির উচ্চপদস্ত রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে, প্রসিদ্ধ আইনজীবী এবং সাংবাদিকরাও খুব সক্রিয়। ১২ মে ২০২১, বিজেপির সাংসদ তাজেসবী সুরিয়া, যিনি দীর্ঘদিন যাবত মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য পরিচিত, তার টুইটার একাউন্টে লিখেছেন, “We are with you. Stay Strong, Israel.” সুরিয়া এই টুইটটি করেছিলেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টুইটের প্রত্যুত্তরে। সুরিয়ার এই টুইটি প্রায় ৫০ হাজারবার লাইক পেয়েছে, এবং প্রায় ১৩ হাজারবার রিটুয়েট করা হয়েছে। উত্তর ভারতের শহর চণ্ডীগড়ের বিজেপীর মুখপাত্র গৌরভ গোয়েল ইসরায়েলি বোমা হামলায়, প্রথম থেকেই ইসরাইলকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন টুইট করেছেন। গত শুক্রবার তিনি তার টুইটে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ছবি যুক্ত করে  লিখেন, “Dear Israelis, You are not alone. We Indians Strongly with You.” পোস্টটি সমগ্র চণ্ডীগড়ে সাড়া ফেলে দেয় এবং এই টুইটের সমর্থনেও অনেক রিটুইট শুরু হয়।

হার্দিক ভাবশার একজন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা, যার টুইটারে প্রায় ১৫ লাখের বেশি ফলোয়ার রয়েছে, এবং খোদ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাই রয়েছেন। তিনি এই শনিবার একটি ভিডিও পোস্ট করেন যেখানে ইসরায়েলের বোমা হামলায় আন্তর্জাতিক মিডিয়া আল-জাজিরা ও Associated Press (AP) এর ফিলিস্তিনি অফিসিয়াল ভবন ধ্বংস হওয়া নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি আবার টূইট করেন “Happy Dipawali liberals. #IndiaStandWithIsrael.” এই টুইটে তিনি উদারবাদী ভারতীয়দেরকে উপহাস করেছেন কারণ তারা ইসরাইলের সামরিক হামলার বিরোধিতা করেন। এই টুইটটিও হিন্দু জাতীয়বাদীদের হাত ধরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পরে। 

অন্যদিকে, ইসরাইলের বোমা হামলার বিরোধী সাংবাদিক রানা আইয়ুব দেশব্যাপী বিজিপির পরিচালিন ইসরায়েলের সমর্থন প্রচারণার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন- দেশব্যাপী মুসলিম বিরোধী পরিবেশ তৈরীতেই বিজেপি সমর্থিত হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ইসরাইলকে সমর্থন করে এধরনণের প্রচারণা চালাচ্ছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিজেপির অনেক মন্ত্রী সরাসরি এই প্রচারণার সাথে যুক্ত, এবং তারা বর্তমানে দেশের কোভিড পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যার্থতাকে ঢাকতেই এমন প্রচারণা চালাচ্ছে। ভারত সরকারের তথ্য বিষয়ক গবেষক ও লেখক শ্রীনিভাস কোডালি বলেন, হিন্দুবতা দলগুলোর কিছু নির্দিষ্ট গ্রুপ ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে কারণ সেখানে মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই গ্রুপগুলো রীতিমত আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে। 

কিন্তু ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে ভারতের আচারণ কি সবসময়ই ইসরায়েলের পক্ষে ছিল? আসলে ব্যাপারটা ছিল একদম উলটো। ভারত ১৯৪৭ সালে উপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পরপরই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনকে ভারত সমর্থন জানিয়ে আসছে, এবং ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ঐতিহাসিকভাবেই ছিল  সহানুভূতিশীল। ভারতই ছিল একমাত্র অনারব রাষ্ট্র যে Palestine Liberation Organization (PLO) কে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি ডি-ফ্যাক্টো এবং আইনত প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত দেয় এবং ১৯৭৫ সালে নয়া দিল্লিতে পিএলওর অফিস খোলার ব্যবস্থা করেন। ১৯৮১ সালে ফিলিস্তিনিদের জন্য ভারত আন্তর্জাতিক সহানুভুতি অর্জনে “Commemorative Postage Stamp” এর প্রসার ঘটান। বিশ্ববাসীকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের নিতে আহ্বান জানান। 

যাইহোক, আপনি যদি ভারতের ফিলিস্তিন সংকট সংক্রান্ত ভারতীয় নীতির বিবর্তনটা খোজেন, আপনি দেখবেন ভারতের স্বাধীনতার অনেক আগেই ভারতীয় স্বাধীনতাকামীরা ফিলিস্তিনিদের সাথে নিজেদের সম্পর্ক বুঝাতে “Brothers-in-Bondage” কথাটা ব্যবহার করতেন। ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি ১৯৩৮ সালে বলেছিলেন, “ফিলিস্তিনিরা আরবের অধিবাসী, যেমন ইংরেজরা ইংল্যান্ডের ও ফরাসিরা ফ্রান্সের অধিবাসী”। যদিও ১৯৫২ ভারত ইস্রাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কিন্তু ভারত- ইস্রাইলি কুটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৯২ সালের পরে স্থাপিত হয়েছিল। ঠিক তখন থেকেই তাদের সম্পর্ক দ্রুত বেগে এগিয়েছে- এবং এই সম্পর্কের মূল ভিত্তিই ছিল প্রতিরক্ষা। বর্তমানে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে ইসরায়েল থেকেই সবচেয়ে বেশি সমরাস্ত্র ক্রয় করে যা প্রায় ইস্রাইলের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৪৬ শতাংশ।

ইস্রাইলের সাথে ভারতের সম্পর্কের উন্নতিকরণে নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহু- উভয়েরই অনেকে গুরুত্ব রয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ভারতের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ইস্রাইল সফর করেন এবং নেতানিয়াহুকে ভারতের “পরম বন্ধু” হিসেবে আখ্যা দেন। লেটার টু ফিলিস্তিন ম্যাগাজিনের সম্পাদক বিজয় প্রসাদ বলেন যে ভারতের সাথে ইস্রাইলের সম্পর্কের মোড় ১৯৯১ সালের পরেই ঘুরে যায়। এক্ষেত্রে উভয়ের সম্পর্কের উন্নতি প্রয়োজন ছিল- ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করণে।

গীতা হারিহারণ যিনি “In Time of Siege” & “The Thousand Faces Of Night” নামে বিখ্যাত বইগুলো লিখেছেন- তিনি বলেন, ভারত যে বিশ্ববাসীর বিপক্ষে গিয়ে ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে তার পিছনে রয়েছে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ- অর্থাত্‌ ইসরায়েল যেমন জায়নবাদকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রটি পরিচালন করছে- ভারতের বিজেপিও তেমনি হিন্দুবতা আদর্শকে ভারতব্যাপী প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গীতা উল্লেখ করেন, ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকে ইসরায়েলের সাথে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির একটা যোগসূত্র ছিল। কিন্তু বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসেন, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আরো অনেকাংশে বেরে যায়। গীতার মতে, ভারতের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ইসরায়েলের মত ধর্মভিত্তিক প্রক্রিয়াকে অনেকটাই কপি করে। 

এছাড়াও, গীতা হরিহরণ ছিলেন পশ্চিমা দুনিয়ায় ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা BDS মুভমেন্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই মুভমেন্টের মাধ্যমে ইসরাইলকে বিশ্বব্যাপী বয়কট, পরিত্যাগ ও অবরোধের ডাক দেয়া হয়। গীতার ভাষ্যমতে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসনকে সমর্থন দিয়ে বিজেপি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মুক্তিকামীদের মহান সংগ্রামকে প্রত্যাক্ষান করেছেন, এবং যে উদ্দ্যেশ্য নিয়ে এই মহান নেতারা আন্দোলনে নেমেছিলেন- ঔপনিবেশ শক্তিকে ভেংগে স্বাধীন ভারত গঠনে, সে উদ্দেশ্যের সাথে ধোকা দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রাইলি জটিল জালে অনেকখানি আবদ্ধ হয়ে গেছে। সমস্যাটা ভারতের বৈদেশিক নীতিতেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কখনই উত্তর-ঔপনিবেশিককালে একটি অবৈধ দখলদারি, আন্তর্জাতিক আইনের অমান্যকারী,এবংমানবতা বিরোধী রাষ্ট্রের সাথে এ ধরনের সৌহার্দ ও সমর্থনমূলক সম্পর্ক রাখতে পারেনা। 

যাইহোক, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার কেন্দ্রীয় ভুমিকায় রয়েছে বিজেপি, তারা তাদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আদর্শ- হিন্দুবতাকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে, ঠিক যেমন ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ব্যাপারে করছে। পাশাপাশি, ভারতের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উত্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে ইচ্ছে তা ভারতকে বেশি বেশি যুক্তরাষ্ট্রমুখী করে তুলছে, এবং ইসরায়েলের সাথে সু-সম্পর্ক ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো জোরালো করবে এটাই নরেন্দ্র মোদীর ভাবনা। তাই হয়তো ভারত পূর্বের আদর্শের জায়গা থেকে অমেকটাই সরে আসতে বাধ্য হয়েছে অথবা বিজেপি সরকার অন্যদেরকে বাধ্য করছে।



অনুদিত 

সুত্রঃ আল-জাজিরা


https://www.aljazeera.com/news/2021/5/18/bjp-expresses-solidarity-with-israel-as-gaza-bombing-continues



















No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.