১ম পর্বঃ প্রাচীন সভ্যতা কিভাবে আধুনিক সমাজ কাঠামোকে প্রভাবান্বিত করেছে?
পৃথিবী জন্মলগ্ন হতে অনেক যুগ কাল পাড় হয়ে এসেছে।মানুষ বিবর্তনের ধারায় পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান আধুনিক মানুষ স্তরে পৌঁছেছেন। তেমনিভাবে মানুষের সামাজিক ব্যক্তিগত,ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় বিবর্তন ও ঘটেছে। চারটি বরফ যুগ ও চারটি আন্তঃবরফ যুগ পাড় হয়ে আসা মানুষেরদের সাথে সভ্যতার পরিচয় ঘটেছে ।প্রতি যুগেই উষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে টিকে থাকা প্রাণীদের দেহের আকৃতিতে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এই আকৃতির পরিবর্তন অন্য প্রাণীদের মতোই মানুষের ক্ষেত্রে ও ঘটেছে। আনুমানিক, দশ লাখ বছর পূর্বে সেই বরফযুগের প্রথম পর্যায়ে জাবা মানব এবং পিকিং মানবদেহের বসবাস ছিলো। নিয়ান্ডারথাল মানবদেহের কন্কাল পাওয়া গেছে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা জুড়ে।ধারণা করা হয়, স্যাপিয়েন্সদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হচ্ছে ক্রোমেনিয়ন আদি মানবেরা। প্রসঙ্গত, ফ্রান্সের ক্রোমেনিয়ন অন্চলের গুহা থেকে এদের ফসিল পাওয়া যায়।
যে সময় মানুষ পাথর ঘষে ঘষে ধারালো অস্র তৈরি করতে শেখে তখন পাথরই ছিলো তাদের একমাত্র হাতিয়ার এবং পাথর দিয়ে দলবদ্ধ ভাবে শিকার করতো, সেই সময়কে পাথর যুগ বলে মনে করা হয়।
পাথর যুগের প্রথম পর্যায়কে বলা হয় পুরানো পাথরের যুগ বা পুরোপলীয় যুগ।সে সময় মানুষের জীবন ছিল শিকারি যাযাবর জীবন। পুরোপলীয় যুগে মানুষের মধ্যে ক্লান এবং টোটেমের(ধর্মবিশ্বাস) চর্চা শুরু হয়। টোটেমের বা ধর্মবিশ্বাসের চর্চা করতে গিয়ে যে সমস্ত বিধিনিষেধ মানা হতো তার নাম ছিলো ট্যাব, পুরোপলীয় যুগের শেষ পর্যায়ে এসে মানুষ শব্দ উচ্চারণের চর্চার মাধ্যমে এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে থাকে।
পুরনো পাথরের যুগ শেষ হয় মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে কৃষিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ যুগকে বলা হয় নতুন পাথরের যুগ বা নবোপলীয় যুগ। কৃষিপ্রধান জীবনে এসে মানুষের নানা প্রাকৃতিক শক্তির পূজা শুরু করে বলে অনুমান করা হয়।
কৃষির প্রয়োজনে এ যুগে মানুষ নদীর তীরে বসবাস শুরু করে।ঘর বাড়ি নির্মান করতে শেখে।যাযাবর জীবনে অবসান ঘটে এবং মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বসবার শুরু করেন। এভাবেই মানব সভ্যতার শুরু হয়।
সেসব সভ্যতার ক্রম বিকাশ উন্নয়নের জন্যেই আমরা আধুনিক যুগে বসবাস করতে পারছি।
প্রাচীন সভ্যতায় কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন( রাজনীতি, সামাজিক কাঠামো,অর্থনিতিক এবং সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়,পারিবারিক বিষয়গুলো) মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট ছিলো,
♦ প্রাচীন সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে নদী,সাগর,কিংবা জলের উৎস রয়েছে এমন স্থানে। নদীর অববাহিকায় জমি খুব উর্বর এবং পণ্য পরিবহন সহজ ছিলো।
উদাহরন : নীলনদের তীরে মিশর সভ্যতা,এজিয়ান সাগরে ক্রিটদ্বীপ, ফেরাত এবং দজলা নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা,সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে সিন্ধু সভ্যতা।
♦ অভিজাত শ্রেণী/ধর্মীয় নেতাগন রাষ্ট্রপ্রধান বলে বিবেচ্য হতেন।অর্থাৎ,শাসকরা এমন ধর্মীয় নেতা হিসাবে বিবেচিত হত যারা দেবদেবীদের প্রতিনিধিত্ব করতেন।বৃহত্তম/শাসিত শ্রেণী ছিল কৃষকরা।
♦ভূমি সম্প্রসারণ এবং নিজস্ব জমি রক্ষায় প্রয়োজনীয়তার ফলে সশস্ত্র সামরিক বাহিনী তৈরী হয়েছিলো।
♦ প্রাচীনযুগে,ক্রমবর্ধমান জীবন যাপনে, কৃষিক্ষেত্র এবং প্রাণিসম্পদের। মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যহত ছিলো।
♦অনেক ক্ষেত্রে, উদ্বৃত্ত খাদ্যের বিনিময় হতো।
♦ মৃৎশিল্প,গহনা,টেক্সটাইল কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
♦ধাতববিদ্যার ও বিকাশ করেছিলো। বিভিন্ন বস্ত তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতবগুলির মধ্যে অনেকগুলিতে ব্রোন্জ্,রৌপ্য, স্বর্ণ, লোহা, টিন এবং তামা অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
♦কিছু কিছু সভ্যতায় কর ও শ্রদ্ধার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। কর হল ব্যক্তি হতে রাজ্যে ধন হস্তান্তর করার এক প্রকার। দুর্বল সরকারদের আরও শক্তিশালীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয়েছিলো।
♦ প্রাচীন সভ্যতায় লেখার ব্যবস্থা ছিলো, খুব দীর্ঘ দূরত্বে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হত। রেকর্ড রাখতে ব্যবহৃত হত। তবে এ ক্ষেত্রে অভিজাতগন প্রাধান্য পেতো।
♦প্রতিটি সভ্যতাতেই সুউচ্চ ভবন নির্মিত হয়েছিলো। কোন কোনটি ধর্ম চর্চা কিংবা মিটিং, স্পোর্টস স্পেস, সরকারী প্রতিষ্ঠান, প্রাসাদ এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ সময়ে হয়তো অনেক পূর্বের,প্রাচীন আবকাঠামো কিংবা অবদানের বেশিরভাগই ধবংস হয়ে গিয়েছে,তবে তা সত্বেও প্রাচীন সভ্যতা আমাদের আধুনিক পৃথিবীতেও অনেক প্রভাব এখনো রয়েছে।
উদাহরন :
♦ মেমফিসের পিরামিড অ্যারেনা,লাসভেগাসের লুক্সার ক্যাসিনো এন্ড হোটেল, জাপানের নিমা স্যান্ড মিউজিয়াম এসব ভবন পিরামিডের আদলে নকশা করা হয়েছে।
♦ প্যারিসের ল্যুভের মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার ও পিরামিডের মতো করে নির্মাণ করা হয়েছে।
♦খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগের রাস্তা তৈরি করার নিয়ম এখনো সড়ক নির্মানে ব্যবহার করা হয়।
♦ রোমানদের তৈরি করা বেশ কিছু পথ এখনো ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা,মধ্যপ্রাচের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সড়ক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
♦ প্রাচীন ব্যাবিলনের পয়ঃনিষ্কাষন ব্যবস্থা চালু হয়েছিলো খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০০ বছর আগে। ধারণা করা হয়, প্রাচীন ব্যাবিলনেই প্রথম কাদা মাথিত করে পাইপের আকার দেয়া হয়,যার মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে,পয়ঃনিষ্কাষন বের করে দেয়া হতো।
♦ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ (রাষ্টপতির বাসভবন) ভবনের সামনের কলাম এবং তোড়ন স্পষ্টত প্রাচীন রোমের স্থাপত্যশিল্প কেই বহন করে।
এই সিরিজে চেষ্টা করবো তুলে ধরতে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতাসহ অন্যান্য সভ্যতা, পুন্জিকার প্রচলিন, সপ্তাহ সাত দিনে গণনা উদ্ভাবন,লিখিত আইনের প্রচলন, যুদ্ধে সর্বপ্রথম লোহার অস্রের ব্যবহার, ব্যাঞ্জনবর্ণের উদ্ভাবন, রাষ্টের ধারণা,বিজ্ঞান চর্চা কারী সকল প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে। সকলকে পড়ার অামন্ত্রণ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ।


No comments