একবিংশ শতাব্দীতে ড্রোন প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের চিরচেনা প্রকৃতি
নভেম্বর ২০০১, মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর সাথে আফগান তলেবানদের যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। তালেবানদের ঘাটি লক্ষ্য করে মার্কিনিদের বি-৫২ বোমারু বিমান আফগানিস্থানে তখন কার্পেট বোম্বিং করছে। কার্পেট বোম্বিংয়ে তুলনামূলকভাবে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলেও সুনির্দিষ্ট লক্ষে নিখুতভাবে আঘাত হানতে এটি তেমন কার্যকর নয়। তখন তালেবানদের অবস্থানে আঘাত হানতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে নতুন এক চালকবিহীন বিমানের যা ড্রোন নামেই অধিক পরিচিত।
১৪ নভেম্বর উজবেকিস্থানের মার্কিন ঘাটি হতে আফগানিস্থানের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করে জেনারেল অটোমিক্স এর তৈরি আকাশ হতে ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম একটি প্রিডেটর ড্রোন। রিয়েল টাইম ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আফগান যুদ্ধের চিত্র তাৎক্ষনাত পৌছে যাচ্ছিল ড্রোন অপারেটরের ও সি আই এ গোয়েন্দাদের নিকট। সেমসয় তারা দেখতে পায় আফগান জিহাদিদের একটি যানবাহনের বহর কাবুলের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে। এবং বিছুক্ষণ পরে এটি একটি ভবনের সম্মুখে দাড়ায়। তাৎক্ষনাত ড্রোন অপারেটর জিহাদিদের অবস্থান লক্ষ্য করে মিসাইল নিক্ষেপ করে এবং তাদের নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়।
![]() |
| চিত্র: জেনারেল অটোমিক্স এর তৈরি প্রিডেটর ড্রোন |
মূলত আফগান যুদ্ধেই মানুষ অস্রবাহী ড্রোনের ব্যবহার প্রথম প্রত্যক্ষ করে। এর পূর্বে ড্রোনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি চালানোর মধ্যে।
বর্তমানে যেকোন দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য ড্রোন বা মানববিহীন বিমান একটি অপরিহার্য বিষয় হিসাবে দেখা দিয়েছে এবং এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে এর ব্যবহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা ও চালকের হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকা। যেখানে একটি চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ক্রয় করতে একটি দেশকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয় করতে হয় সেখানে ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যয় করেই মিসাইল বহনে সক্ষম ড্রোন ক্রয় করা সম্ভব। এছাড়াও সুনির্দিষ্ট লক্ষে আঘাত হানতে ,যা প্রিসিশন স্ট্রাইক নামে পরিচিত, ড্রোনের জুড়ি মেলা ভার।
বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এই শিল্পের বেশিরভাগ অংশই দেশ দুটির দখলে। কিন্ত বেশ কয়েক বছর যাবৎ চীন এবং তুরস্ক ড্রোন শিল্পে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে এবং এই শিল্পে তাদের সম্প্রতি উত্থান বেশ লক্ষনীয়।
সামরিক কৌশলবিদরা আর্টিলারিকে যুদ্ধের ভাগ্য বিধাতা হিসাবে অভিহিত করলেও খুব দ্রুতই ড্রোন এর স্থলভিসিক্ত হবে বলে অনেক বিশ্লেষকই ধারণা করছেন। সিরিয়া, লিবিয়া এবং সম্প্রতি নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মানববিহীন বিমান বা ড্রোনই বিজয়ী এবং পরাজিতের মধ্যে মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি সংগঠিত নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধকে যদি কৌশলগত দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব সহযেই অনুধাবন করা সম্ভব হবে। নাগর্নো-করাবাখ আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে একটি বিতর্কিত অঞ্চল। আন্তর্জাতিকভাবে এটি আজরবাইজানের অংশ হিসাবে স্বীকৃত হলেও আর্মেনিয়ার সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে জাতিগত আর্মেনীয়রা এটি দখল করে রেখেছিল। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নব্বই এর দশকে দেশ দুটির মধ্যে এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। যুদ্ধে আর্মেনীয়রা কারাবাখে তাদের দখল বজায় রাখার পাশাপাশি আজারবাইজানের কিছু অংশও দখল করে নেয়।
পরবতর্ীতে দেশ দুটি যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হলেও তাদের মধ্যে ভবিষ্যত যুদ্ধের সম্ভাবনা বজায় ছিল। কারণ আজারীরা তাদের দখলকৃত ভূমি উদ্ধারে ছিল বদ্ধপরিকর। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে পুনরায় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। পূর্বের যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার ফলে আর্মেনীয় সেনাদের মনোবল ছিল তুঙ্গে। অপর দিকে আজারীরা পূর্বের যুদ্ধের ক্ষত শুকিয়ে তাদের সামরিক বাহিনীকে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্রে সজ্জিত করে তোলে। যার মধ্যে তুরস্ক ও ইসরায়েল হতে সংগৃহীত টিবি-২ ও হারোপ ড্রোন ছিল অন্যতম।
![]() |
| টিভি- ২ |
যারা বর্তমানের আধুনিক যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে কিছুটা ওয়াকিবহাল তারা নিশ্চই জানেন যে প্রায় সব সার্বভৌম দেশই তার আকাশ সীমা নিরাপদ রাখার জন্য ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্র (সার্ফেস টু এয়ার মিসাইল যা সংক্ষেপে স্যাম নামে পরিচিত) এর উপর নির্ভরশীল।
এর সাহায্যে শত্রু পক্ষের বিমান ও মিসাইল আকাশেই ধ্বংস করা সম্ভব। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যদি কোনভাবে নিস্ক্রিয় করা সম্ভব হয় তাহলে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা বহুলাংশে বেড়ে যায়।
আর্মেনীয় বাহিনীও নাগনোর্-কারাবাখের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত সংখ্যক স্যাম সিস্টেম মোতায়েন রেখেছিল। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আজারি বাহিনীর জন্য অন্যতম হুমকি হিসাবে দেখা দেয়। তাদের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য আজারি বাহিনী চতুর এক কৌশলের আস্রয় গ্রহণ করে। তারা তাদের সংগ্রহে থাকা পুরাতন কিছু এএন-২ পরিবহন বিমান একবার ব্যবহার উপযোগী ড্রোনে রূপান্তর করে। এই বিমানগুলো তারা আর্মেনীয় প্রতিরক্ষা লাইনের দিকে পাঠাতো। এই বিমান গুলোকে আসন্ন হুমকি মনে করে ধ্বংস করার জন্য তারা স্যাম সিস্টেমের রাডার চালু করে মিসাইল নিক্ষেপ করতো এবং তখন তাদের অবস্থান বহু উপরে উড়তে থাকা আজারি বাহিনীর টিবি-২ ড্রোনের নজরে পরে যেত। তখন তা খুব সহযেই মিসাইল নিক্ষেপ করে নিস্ক্রিয় করা সম্ভব হয়। এছাড়াও এই ড্রোনের অতি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা ও সেন্সরের সামনে কোন ক্যামোফ্লাজই তেমন কার্যকর নয়। এই ড্রোনগুলো আক্রমনের পাশাপাশি যুদ্ধ ক্ষেত্রের রিয়েল টাইম ভিডিও ও চিত্র পাঠাতো যার উপর ভিত্তি করে আর্টিলারির সাহায্যে আর্মেনীয় অবস্থানের উপর প্রিসিসন স্ট্রাইক চালানো সম্ভব হয়।
![]() |
| আই এ আই এর তৈরি হারোপ কামিকাজে ড্রোন |
যুদ্ধে টিবি-২ ড্রোন ছাড়াও আজারবাইজান ইসরায়েলি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আই এ আই) এর তৈরি হারোপ কামিকাজে (আত্নঘাতি) ড্রোন ব্যাপক সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিল। এই ড্রোনের মূল কাজ শত্রু শিবিরের উপরে ইতস্ত ঘুরে বেড়ানো। এটি সাধারণত শত্রুর দৃষ্টি ও শ্রবণসীমার বাইরে থেকে ওত পেতে থাকে মোক্ষম শিকারের খোঁজে। আবার আকারে ছোট হওয়াও শত্রুর রাডারে ধরা পরার সম্ভাবনাও অত্যন্ত কম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এই ড্রোনটি উপযুক্ত টার্গেট খুজে পেলে নিজেই মিসাইলের মতো সেই টার্গেটের উপর হামলে পরে। যদি এটি কোন উপযুক্ত শিকার খঁুজে না পায় বা মিশন বাতিল করা হয় তাহলে সহযেই এটি ঘাটিতে ফিরে আসতে পারে।
আজরবাইজান সরকার দাবি করে যুদ্ধে তারা আর্মেনীয় বাহিনীর এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক সমমূল্যের সমরাস্র ধবংস করেছে যার মধ্যে এক ডজনেরও বেশি স্যাম সিস্টেম রয়েছে।
ড্রোনের এতো বহুমুখী ব্যবহার সম্প্রতি সংগঠিত নাগনোর্-কারাবাখ যুদ্ধের পূর্বে কোথাও লক্ষ্য করা যায়নি। এই যুদ্ধ সম্পর্কে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকার চীফ এডিটর শেখর গুপ্ত মন্তব্য করেন যে, আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে কারাবাখ যুদ্ধই প্রথম যুদ্ধ যেখানে আজারবাইজান পুরোপুরি ড্রোনের উপর ভিত্তি করে বিজয় অর্জন করে।
বর্তমানে এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হওয়ায় বিভিন্ন নন স্টেট এক্টররাও নিজেদেরকে এই প্রযুক্তিতে সজ্জিত করছে এবং বিভিন্ন সময় সেগুলো স্বল্প আকারে ব্যবহারের প্রমাণও মেলে। যেমন, ২০১৮ সালে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর উপর আত্নঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে হামলা করা হয় যা থেকে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রনহীন বিস্তার হয়তো এক অত্যাসন্ন ক্রান্তিকালেরই ইঙ্গিত বহন করছে।
তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সামনের দিনগুলেতে যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুলভাবে ড্রোন ব্যবহৃত হবে এবং ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই হয়তো বিভিন্ন দেশ মিলিটারি স্ট্রাটেজি প্রণয়ন করবে।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





No comments