চাদের সামরিক অভ্যুত্থান ও আফ্রিকার গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর ভবিষ্যৎ
ক্ষমতার পরিবর্তনকালে রাজনৈতিক যে অস্থিরতা তৈরি হয় তাকে স্থিতিশীল করণের উদ্দ্যেশ্যে সম্প্রতি আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে সামরিক ক্যু বা অভ্যুত্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পরিবর্তনকালীন স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সামরিক শাসনে আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চরম ঝুকির মধ্যে পরতে পারে। সামরিক জান্তার ভাষ্যমতে, স্বল্পকালীন নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিকাশে এই সামরিক অভ্যুত্থানকে কখনোই নির্ভরযোগ্য অপশন হিসেবে মনে করেন না। উপরন্তু, এই সামরিক হস্তক্ষেপ যে চলমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো অচল করে তুলবে সে কথাই বলেছেন।
চাদে বর্তমানে যে সামরিক ক্যু বা অভ্যুত্থানটা হল তা সাধারণত এই কথাগুলোর জীবন্ত প্রমাণ। চাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দেবীর মৃত্যুর পর সামরিক বাহিনী খুবই দ্রুত রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেন। তৎক্ষনাৎ ইদ্রিস দেবীর পুত্র মোহাম্মদকে দেশের অন্তবর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ও সামরিক কমান্ডার হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। সেনাবাহিনী প্রধানের ভাষ্যমতে, মোহাম্মদ পরবর্তী ১৮ মাস পরিবর্তনকালীন সামরিক কাউন্সিলের নেতৃত্ব প্রদান করবেন। এছাড়াও সংসদ ও সরকার ব্যবস্থা ভেংগে দেয়া হয় এবং সংবিধানকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
উল্লেখ্য, চাদের সংবিধানে বলা আছে যে যদি কোন রাষ্ট্রপতি মারা যান বা অভিশংসিত হন, তবে সেই জায়গায় জাতীয় পরিষদের চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরপরই সাংবিধানিক এই মূলনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং দেশব্যাপী মার্শাল আইন জারি করেন। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বলেন, সংসদ ভেংগে দেয়া ও সংবিধান রহিত করার একমাত্র কারণ দেশজুড়ে একটি স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তরকে নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন গণতান্ত্রকামীদের এ কথাগুলো মনপুত হবে না, বিশেষত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কাছে। কারণঃ
· প্রথমতঃ সামরিক সমর্থিত সরকার ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। সর্বপ্রকার সামাজিক প্রতিরোধকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের হামলা-মামলার মাধ্যমে রাজপথ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
· দ্বিতীয়তঃ সাবেক প্রেসিডেন্ট ইদ্রিসকে হত্যাকারী চাদের সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনী Front For Change And
Concord in Chad এর সাথে কোনরূপ সংলাপ বা সংঘাত বিরতির প্রস্তাবনাকে নাকচ করেছে দেশের সামরিক জান্তা। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রত্যাখ্যান দেশের শান্তির পরিবেশকে আরো ঘোলাটে করে তুলবে। ফলে বিপ্লবী বাহিনীর পক্ষ থেকে যেকোন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকেই সামরিক সরকার কাজে লাগাবে তাদের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করতে।
·
তৃতীয়তঃ আলবার্ট পেতাকাকে বর্তমান সামরিক জান্তা দেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেছেন। এলবার্ট গত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দেবীর প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্বাচনে লড়েছিলেন। সাধারণ নাগরিক ও বেশিরভাগ রাজনীতিবিদরা এলবার্টকে নির্ভরযোগ্য প্রার্থী হিসেবে মেনে নেননি, এবং সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের পিছনে যে তার একটি বড় ইন্ধন রয়েছে তা আচ করতে পারছেন।
যাইহোক, শুধু চাদই একমাত্র দেশ নয় যারা এই সামরিক হস্তক্ষেপের পথে হেটেছে। সম্প্রতিকালে অনেকগুলো ক্যু হয়েছে সমগ্র আফ্রিকা জুরে। যেমনঃ
·
২০২০ এর আগস্টে মালিতে
·
২০১৯ সালে সুদানে
·
২০১৭ সালে জিম্বাবুয়েতে
·
২০১১ ও ২০১৩ সালে মিশরে পরপর দুটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে প্রভৃতি।
এই ক্ষেত্রে আমরা আরো একটু গভীরে যাবো এবং খুজে দেখবো যে কেন আফ্রিকায় এই হরহামেশাই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটছে? এর কারণগুলি খোঁজার চেষ্টা করবো? কয়েকটি দেশকে উদাহরণ হিসেবে আলোচনা করবো এবং সর্বোপরি, চাদের সামরিক অভ্যুত্থান ও আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যত নিয়ে কিছু কথা বলব।
আফ্রিকায় সামরিক অভ্যুত্থানের কারণ বিশ্লেষণঃ
সামরিক ক্যু বা অভ্যুত্থান বরাবরই উন্নয়নশীল, অনুন্নত বা নব্য স্বাধীন দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী আধুনিক ইউরোপের কিছু রাষ্ট্রে সামরিক শাসন দেখলেও তারা কিন্তু ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবং পরবর্তীতে তারা সামরিক ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেমন জার্মানি ও ইতালি।
কিন্তু বর্তমান উন্নয়নশীল বা অনুন্নত রাষ্ট্র যারা এই অভ্যুত্থানের শিকার তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় থাকার দরুন আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গনতান্ত্রিক চর্চায় তাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার দীনতা- সামরিক জান্তাদের অনেকক্ষেত্রেই ক্ষমতা দখলে প্রলুব্ধ করে থাকে।
প্রফেসর ক্লদ ওয়ালেস আফ্রিকার রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর গবেষণা করেছেন। তিনি বেশ কিছু মৌলিক কারণ উল্লেখ করেছে তার লিখিত “Soldiers and State in Africa” প্রবন্ধে যা সবসময়ই আফ্রিকার বিভিন্ন সামরিক জান্তাদের ক্ষমতা দখলে প্রলুব্ধ করেছে।
যথাঃ
· জনগণের দৃষ্টিতে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দলগুলোর মর্যাদায় একটা ভাটা তৈরি হওয়া
·
রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ সংজ্ঞায়নকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর পারস্পরিক অন্তর কোন্দল
·
সামরিক অভ্যুত্থানগুলো সবসময়ে সামরিক বাহিনীর ভিতর থেকে ঘটেছে। বহিঃশক্তির সরাসরি ইন্ধন থাকে না এক্ষেত্রে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে গুপ্তচরদের একটি বড় প্রভাব থাকে।
·
দুর্নীতি বিস্তার ও ন্যায়বিচারের অভাব
·
অন্য রাষ্ট্রের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। ইত্যাদি
সামরিক অভ্যুত্থান ও আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাঃ
যে কথা উপরে বললাম, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে ১৯৬০ পরবর্তী আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো সম্পর্কে তেমন কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা, পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শক্তিদের নব্য-উপনিবেশবাদ স্থাপন আফ্রিকাকে ঘিরে তা অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, ফলাফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষ, মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সব সময় লেগেই আছে। এছাড়াও আধুনিক সময়ে যুক্ত হয়েছে অনেক সন্ত্রাস ও উগ্রবাদী দল যারা সরকারকে সবসময়ই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাখতে চাচ্ছে। এই সুযোগটাই নিয়েছে অভ্যুত্থিত রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী। উপরে যে কয়েকটি ক্যু-এর কথা উল্লেখ করলাম সব জায়গায় ক্লদের বর্ণিত কারণের সাথে মিল রয়েছে। যেমন ধরুন মালির কথা। অভ্যুত্থান হয়েছিল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভংগুর অবস্থার দরুন। কিন্তু পরবর্তীতে পশ্চিমা আফ্রিকার অর্থনৈতিক কমিউনিটির মত আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সামরিক জান্তাকে জোর করেন ক্ষমতাকে জনগনের প্রতিনিধির হাতে হস্তান্তর করতে, এবং সেনাবাহিনী তা মেনেও নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে বেসামরিক সরকারের যে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় সেখানে নেতৃত্ব প্রদান করে সেনা সমর্থিত প্রতিনিধিবৃন্দ।
একই দৃশ্য সুদান জিম্বাবুয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। সেনাবাহিনী কিছু চুক্তির ভিত্তিতে সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছে। চুক্তির মুলকথা প্রায় একই, মন্ত্রণালয়ের বড়সড় পদগুলো সেনা সমর্থিত প্রতিনিধিদেরই দিতে হবে এবং সামরিক সরকার যাবতীয় নীতিমালা প্রনয়ণ ও প্রয়োগে সেনাবাহিনীর মতাদর্শের সাথে মিল রেখে করবেন। অর্থাৎ বেসামরিক সরকারকে পরোক্ষভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেনাবাহিনীর উপর পূর্ন নির্ভরশীল হতে হবে। এছাড়াও, গনতান্ত্রিক চর্চায় সেনাবাহিনীর নীতিমালার প্রয়োগ ঘটাতে হবে ফলে সামরিক গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নামে এক নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
অতএব, যদি চাদের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র বা রাজনীতির কথা বলি, তা আঞ্চলিক অন্য দেশগুলোর মত সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে যাচ্ছে এবং সরকার ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র হতে যাচ্ছে সামরিক জান্তাদের উচ্চাকাঙ্খা।
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রেফারেন্সঃ
আফ্রিকার ইতিহাস, মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন,
বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী।
Enenchong,S. (2021). Covert
coup in Chad and Future of African democracy. https://theconversation.com/amp/chads-covert-coup-and-the-implications-for-democratic-governance-in-africa-159725
https://www.bbc.com/news/world-africa-56830510




No comments