ফিলিস্তিনঃ স্বাধীনতার স্বপ্ন, জায়নবাদী আগ্রাসন ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি
২০১৪ সালে লিখেছিলাম, বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক মনে হলো তাই আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আশাকরি, মুল লেখা পড়ে আপনারা কিছু প্রশ্নের উত্তর পাবেন। ধন্যবাদ
--------------------------------------------------------------------------
গাজা – ২৪ ফুট উঁচু কংক্রিটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পৃথিবীর বৃহত্তম কারাগার - সেখানে ছয় দিন ধরে নির্বিচারে মানুষ মারছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক Zionist রাষ্ট্র ইসরায়েল। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কোনো এক ফিলিস্তিনী তরুণের রকেট হামলা আর ১০-১২ বছরের শিশুর ছোঁড়া পাথরের টুকরোর বদলে এফ-১৬ ও অ্যাপাচি থেকে মুহুর্মুহু ছুটে আসা বোমার আঘাতে শতচ্ছিন্ন দেহ লুটিয়ে পড়ছে এখানে-সেখানে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে মৃতের সংখ্যা প্রায় দুইশত, আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বহু আগেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে দুই পক্ষকেই শান্ত হওয়ার ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু কে থামাবে এই অসম যুদ্ধ? দায়িত্বটা কার? জাতিসংঘের? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের? রাশান ফেডারেশনের? ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের? আরব রাষ্ট্রগুলোর? নাকি ইসরায়েলের নিজের? বিশ্বমোড়ল (নখ-দন্তবিহীন) জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আর আহত-নিহতের পরিসংখ্যান দিয়েই আপাততঃ ক্ষান্ত।
অপর বিশ্বমোড়ল (ধারালো নখর-দন্তযুক্ত) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, “ইসরায়েলের নিজের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে”। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি সাহেব তো আফগানিস্তানে ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে ব্যস্ত ভাড়াটে কুকুরের দলের লড়াই থামাতে কুটনৈতিক তৎপরতায় এতোটাই মশগুল যে ফিলিস্তিন নিয়ে অযথা মাথা ঘামানোর সময় কোথায় তার! হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতার স্বাদ পুনরায় ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মরিয়া রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েই আপাতদৃষ্টিতে চুপ। বাকিদের কথা বলে কি-বোর্ডের উপর অযথা চাপ প্রয়োগ না করাটাই শ্রেয়। ও হ্যাঁ, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ইরানসহ বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশের সরকারগুলো জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছে যাতে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কবে থামবে ৬৬ বছর ধরে চলে আসা এই যুদ্ধ? আশা করাই যায় উত্তরটা কারোর জানা নেই।
প্রতিবাদে মুখর বিশ্বের সচেতন মানুষ। নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে চলছে সরব ও নীরব প্রতিবাদ। প্রতিবাদ চলছে রাস্তায় মিছিলে-স্লোগানে, হাটে-বাজারে-দোকান-পাটে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে, চলছে ফেসবুক-ব্লগের লেখায়, পত্রিকার পাতায়, কার্টুনিস্টের কার্টুনে, শিল্পীর সঙ্গীতে। সবাই প্রতিবাদ জানাচ্ছে, যার যার নিজের অবস্থান থেকে। কেউ কেউ আবার আবেগ নিয়ে খেলার চেষ্টায় ব্যস্ত, ধর্মীয় মোড়কে আবৃত করে ইহুদী-খ্রিস্টান বিদ্বেষ ছড়িয়ে বৃহত্তর মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে ‘জিহাদে’ অংশগ্রহণ করাই এদের লক্ষ্য। ইহুদী পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে ইতোমধ্যে – “পেপসি-ফ্যান্টা খাবো না” – “ফেসবুক চালাবো না” – ইত্যাদি ইত্যাদি বচন। ‘অ্যান্টি-সেমেটিক’ (ইহুদী-আরব বিদ্বেষী) ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান ও বিশ্ব ইতিহাসের ‘মহান একনায়ক ও খুনী’ হিটলারকেও সমর্থন করা কিংবা সমালোচনা (ইহুদীদের সমূলে উৎপাটিত না করার অপরাধে) করাটাও ফ্যাশনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
কিন্তু সমস্যার গভীরে কি একবারও যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে? গাজার এই পরিণতির জন্য আসলে দায়ী কে? ইহুদীবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ইসরায়েল, হলোকাস্টের জনক হিটলার, ক্রিশ্চিয়ান-প্রধান পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, মুসলিম-প্রধান আরব রাষ্ট্রসমূহ, জাতিসংঘের ব্যর্থতা নাকি ফিলিস্তিনের নেতৃত্বের সংকট?
‘দায়ী কে’ তা খোঁজার আগে একবার চোখ বোলানো যাক ইসরায়েলের জাতীয় সঙ্গীতের দিকে। একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই এরকম UNIQUE জাতীয় সঙ্গীত আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাবেন না।
“As long as in the heart, within,
A Jewish soul still yearns,
And onward, towards the ends of the East,
An eye still gazes toward Zion;
Our hope is not yet lost,
The hope of two thousand years,
To be a free people in our land,
The land of Zion and Jerusalem.”
এই সঙ্গীতের উৎস খুঁজতে হবে আমাদের ইতিহাসের পাতায়। ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে থিওডোর হারৎজেল-এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া Zionist Movement-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ভূ-খণ্ডে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে ইউরোপে নির্যাতিত ইহুদীরা। এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসরায়েল রাষ্ট্র কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়ে নানা রকম তত্ত্ব দেওয়া হয় সে সময়। উগান্ডা, আলাস্কা এমনকি মাদাগাস্কারেও ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় কেউ কেউ। কিন্তু কেনো ইহুদীদের ফিলিস্তিনেই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে? ইহুদীরা ইউরোপ, আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকাসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই বসবাস করছিলো। কি হয়েছিলো সেসব দেশে?
ইউরোপের সভ্য দেশসমূহে ইহুদীরা শিকার হচ্ছিলো Racism-এর। একই সাথে যীশুর হত্যাকারী হিসেবে ইহুদীদের নিগ্রহের স্বীকার হতে হয় ইউরোপের ক্রিশ্চিয়ান সমাজে। তা থেকে মুক্তি এবং ঈশ্বর কর্তৃক ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাই মরিয়া হয়ে উঠলো Switzerland-এর Basel-এ অনুষ্ঠিত First Zionist Congress-এ সম্মিলিত ইহুদী নেতৃবৃন্দ (১৮৯৭ সাল)। দুই হাজার বছর আগে ফিলিস্তিনে এসব ইহুদীদের পূর্বপুরুষ বসবাস করতো এবং ঈশ্বর কর্তৃক ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’, তাই এটিই ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র ভূমি – এরকম একটি অবাস্তব যুক্তিতে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীল-নকশা প্রণয়ন করে Zionist নেতারা এবং ১৮৮২ সাল থেকে ‘আলিয়া’ (আগমন)-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশ শুরু করে ইহুদীরা। ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরব Landlord-দের কাছ থেকে প্রথমে কিনে নেওয়া হয় ফিলিস্তিনের জমি, ধীরে ধীরে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী আরবদের এবং শুরু হয় ‘অবৈধ বসতি স্থাপন’।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তুর্কিদের হাত থেকে ফিলিস্তিন চলে যায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের অধীনে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘ব্যালফোর ঘোষণা’ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে স্বীকৃতি দেয় এবং একই সাথে স্থানীয় আরবদের বহিরাগত হিসেবে গণ্য করে। এই ঘোষণার ফলে Zionist নেতারা সুযোগ পেলো ফিলিস্তিনের ভূমিতে যা ইচ্ছা তাই করার বৈধতা। Zionist সন্ত্রাসবাদের সুত্রপাতও সেখান থেকেই। ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে ও ফিলিস্তিনীদের নিশ্চিহ্ন করতে গড়ে তোলা হয় ‘Irgun Zvai Leumi’ (National Military Organization) ও ‘Lohamei Herut Israel’ (Stern Gang)-এর মত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। এই সংগঠনেগুলোর কাজ ছিলো ব্রিটিশ সৈন্যদের উপর সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করা ও ফিলিস্তিনীদের মনে আতংক তৈরি করা যাতে তারা বেশ ভালোভাবেই সফল হয়েছিলো।
‘Irgun’ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাটি চালায় Kings David Hotel-এ যাতে ৮৮ জন নিহত হয় এবং ৭ তলা হোটেলটি ধ্বসে পড়ে। এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ‘Irgun’ কমান্ডার Menachem Begin, পরবর্তীতে যিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীত্ব লাভ করেন এবং ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ পান । Zionist সন্ত্রাসীদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া অবশ্য ইসয়ায়েলের জন্য নিত্য-নৈমিতিক ব্যাপার। Zionist সন্ত্রাসীদের এ তালিকায় আরো আছে আইজ্যাক শামির (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী), এরিয়েল শ্যারন (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) এবং ১৯৪৮ সালে এক দিনে ৪০২৬ জন ফিলিস্তিনী হত্যার মূল হোতা আইজ্যাক রবিন (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী ও ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ বিজয়ী)।
ওদিকে ততদিনে জার্মানীর ক্ষমতায় আসা হিটলার ইউরোপে ‘হলোকাস্ট’-এর মাধ্যমে ইহুদী নিধন শুরু করলে ইহুদীরা পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করে ফিলিস্তিনে স্বাধীন ‘ইসরায়েল’ রাষ্ট্র স্থাপনের বৈধতা পেয়ে শুরু করে দ্বিতীয় হলোকাস্টের। যে হলোকাস্টের শিকার ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণ, হিটলার কর্তৃক কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করলো স্বাধীন ফিলিস্তিনবাসী। ফিলিস্তিন জুড়ে শুরু হয় ‘Ethnic Cleansing’ ও ভূমি দখল। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ-১৫ মে তারিখের মধ্যেই দখল করা হয় ২০০ গ্রাম, বিতাড়িত হলো ২,৫০,০০০ ফিলিস্তিনী আর চালানো হল একের পর এক গণহত্যা। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ছেড়ে চলে যাবার সাথে সাথেই ১৪ মে, ১৯৪৮ তারিখে ঘোষণা করা হল ইসরায়েলের স্বাধীনতা।
যে চর্চা Zionist নেতারা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই শুরু করছিলো তা অব্যাহত থাকে ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়েও। অর্থাৎ এটা পরিস্কার যে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের সাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩-এ সঙ্ঘটিত আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল ও ফিলিস্তিনীদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আরো দ্রুত হয় যার ফলে ফিলিস্তিনের ৯০%-এরও বেশি পরিমাণ ভূমি আজ ইসরায়েলের দখলে; যেখানে ১৯৩৭ সালে ইহুদীরা ফিলিস্তিনের মাত্র ৫.৮% ভূমির মালিক ছিলো। তো ইসরায়েলের জাতীয় সঙ্গীতের নিগূঢ় অর্থ নিশ্চয়ই এতোক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে। আর একই সাথে বছরের পর বছর ধরে চলা ‘অবৈধ বসতি স্থাপন’ও কেনো সমানতালে এগিয়ে চলেছে তা বোঝাটাও খুব কষ্টের না; যেমনটা কষ্টের না এটা বোঝা যে কেনো অব্যহত রয়েছে ইসরায়েল কর্তৃক নিরীহ ফিলিস্তিনীদের অপহরণ, গ্রেফতার ও নির্বিচারে হত্যার উৎসব। সুতরাং ইসরায়েল যে রাষ্ট্র হিসেবে দায়ী তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু ইসরায়েলই কি একমাত্র অপরাধী? বারবার ইসরায়েলকে মদদ দিচ্ছে কে? ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র কে? অবশ্যই বিশ্বমোড়ল (ধারালো নখর-দন্তযুক্ত) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। ইসরায়েলের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার উৎস, আর্থিক ও সামরিক সহায়তাকারী এবং কূটনৈতিক উদ্ধারকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Founding Father-গণ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি যত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এসেছেন সবার মুখেই ইসরায়েলের জন্য ঝরে পড়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Founding Father-দের অন্যতম টমাস জেফারসন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এবং জন অ্যাডামস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি Official Seal-এর ডিজাইন দেন যাতে আঁকা ছিলো ‘মোজেসকে অনুসরণ করে ইহুদীরা লোহিত সাগর পাড়ি দিচ্ছে’। তাঁদের কাছে এর অর্থ ছিলো, “Rebellion to Tyrants is Obedience to God”। জন অ্যাডামস একবার বলেছিলেন, “I really wish the Jews again in Judea an independent nation…..”। এমনকি দাস প্রথা বাতিল করা প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কানাডিয়ান এক Zionist নেতাকে বলেছিলেন যে “নির্যাতিত ইহুদীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এমন একটি মহৎ স্বপ্ন যা বহু আমেরিকান লালন করে”।
সাবেক প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মতে প্রাচীন ইহুদী জাতি আমেরিকান কলোনী স্থাপনকারীদের জন্য আদর্শ মডেল ছিলো। তিনি এমনকি বেলফোর ঘোষণাকেও সমর্থন করেছিলেন ৩ মার্চ, ১৯১৯ সালে দেওয়া তাঁর এক বক্তৃতায়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি, লিন্ডন জনসন, রিচার্ড নিক্সন, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রিগান, বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ এমনকি বর্তমান প্রেসিডন্ট বারাক ওবামাও তাঁদের বহু বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রতি খোলাখুলি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে ইসরায়েল কি করে এতো দুঃসাহস দেখাতে পারে যার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি বিশ্ব জনমতকে থোড়াই কেয়ার করে বছরের পর বছর ধরে হত্যার উৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। আর শুধুমাত্র ‘ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি’ কিংবা ‘অসলো অ্যাকর্ড’ সই করে Irgun সন্ত্রাসী Menachem Begin আর আইজ্যাক রবিন কর্তৃক নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পেছনের গল্পও যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরায়েলের এই বিশেষ সম্পর্কেরই ফসল তাও খুব সহজেই অনুমেয়।
সুতরাং এখন গাজায় নির্বিচার বোমা বর্ষণ আর মানুষ হত্যার এই উৎসবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমান অংশীদারীত্ব অস্বীকার করার কোনো পথ যেমন খোলা নেই, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই হামলা বন্ধে চাপ প্রয়োগ করে রাজি করাবে কিংবা প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করবে – তেমনটা ভাবারও কোনো অবকাশ নেই। আর এতো কিছু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাভ? এটা একটা বাচ্চাও জানে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনিদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল ইসরায়েল যে প্রতিনিয়ত সর্বতোভাবে মার্কিনি স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছে।
সর্বশেষ বলতে হয় ইসলামের কথিত ধারক-বাহক ‘মহান আরব শাসক’দের কথা। মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত এসব ভণ্ড শাসকগণের যাবতীয় ভণ্ডামি ও পশ্চিমাদের সাথে গোপনে ওঠা-বসার রাজনীতির কারণেই আরব রাষ্ট্রগুলো কখনোই এক হতে পারেনি। ১৯৪৮-এর যুদ্ধে ট্রান্সজর্ডানিয়ান বাদশাহ আবদুল্লাহ’র জর্ডান সীমান্তে নিজ সীমানা রক্ষার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালনের কারণেই ৭টা আরব রাষ্ট্রের মিলিত সৈন্যবাহিনীকেও পরাজিত হতে হয়েছিল ইসরায়েলের সৈন্যবাহিনীর কাছে। এরপর আরো ৩টা যুদ্ধ হলেও একের পর এক আরব রাষ্ট্র সন্ধি করতে থাকে ইসরায়েলের সাথে। ১৯৭৯ সালে মিসরের আনোয়ার সাদাত সন্ধি করলো ইসরায়েলের সাথে, জর্ডান করলো ১৯৯৪ সালে। মিসর ও জর্ডান তখন থেকেই ইসরায়েলের খুব ভালো বন্ধু। এই মিসর ও জর্ডানের কাছ থেকেই ১৯৬৭ সালে মাত্র ‘৬ দিনের যুদ্ধে’ গাজা ও পশ্চিম তীর দখল করেছিলো ইসরায়েল। মাঝখানে মোহাম্মদ মুরসি কিছুদিন ক্ষমতায় থেকে মিসরের সাথে পুরনো দোস্তিতে ফাটল ধরাচ্ছিলেন, তাই সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁকে ও তাঁর দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কাজটা আপাততঃ প্রক্রিয়াধীন।
আর যুদ্ধের এতো ডামাডোলের মধ্যেও মুসলিম বিশ্বের মোড়ল ‘সৌদি আরব’ বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছে। শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্বের কারণে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান তাতে ইসয়ায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হয়েছে (এবং এখনও হচ্ছে) সবচেয়ে বেশি। মাঝখানে বাংলাদেশের মত মুসলিমপ্রধান দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ জানতেও পারছে না তাদের স্বপ্নের পূণ্যভূমি সৌদি আরবের বাদশাহ ও আমীর-ওমরাহগণ এরই মধ্যে যে ভিতরে ভিতরে ইসরায়েলের সাথে গভীর এক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তাদের ‘অভিন্ন শত্রু’ ইরানকে প্রতিহত করতে। ক’দিন আগে সৌদি যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন তালাব বলেছেন, ‘’Iran is a huge threat….especially against the Sunnis. The threat is from Persia, not from Israel”। কিছুদিন আগে লেবাননের বৈরুতে ইরানের অ্যাম্বেসীতে সন্ত্রাসী হামলার পেছনের কুশীলব যে সৌদি আরব ছিলো তাও প্রকাশ হয়ে গেছে। অপরদিকে সিরিয়া ও ইরাকের রাজনৈতিক অবস্থা এতোটাই শোচনীয় যে গাজা তাদের কাছে কোনো ইস্যুই না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আর তাই গাজায় শয়ে শয়ে মানুষ মরে গেলেও সৌদি আরব, জর্ডান কিংবা মিসরের কিছুই যায় আসে না। তাহলে অবস্থা বিশ্লেষণে যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হল এই যে, গাজায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা রোধ করার জন্য আপাতদৃষ্টিতে কারোরই তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। অপরদিকে ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে যে, বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই ইসরায়েলকে তার সিধান্ত থেকে জোর করে সরাতে পারবে না।
আপনি তাহলে কাকে দায়ী করবেন? সেটা একান্তই আপনার নিজস্ব মতামত। আমরা যতই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে হইচই করি না কেনো তাতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা থামবে না। অপরদিকে এভাবে ইহুদী পণ্য বর্জনের চিন্তাটা আসলে একটা Racism-কে প্রতিহত করতে গিয়ে আরেকটা Racism-এর জন্ম দেওয়ারই নামান্তর, যেটা আজ থেকে ৬৬ বছর আগে ইসরায়েল শুরু করেছিলো ফিলিস্তিনী ভূমি দখল ও ‘দ্বিতীয় হলোকাস্ট’ শুরুর মাধ্যমে। হিটলারকে সমর্থন করা কিংবা ইহুদীদের নিশ্চিহ্ন না করার অপরাধে সমালোচনা করাটাও একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটা অন্যায়কে সমর্থন দেওয়া ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
একটু খেয়াল করে দেখুন তো, যে দীর্ঘ ঘটনার বর্ণনা দিলাম এতোক্ষণ, সেই একই ঘটনা আপনার-আমার আশেপাশেও ঘটছে কিনা? আমার নিজের দেশেও কি একইভাবে অবৈধ উপায়ে ‘সেটলার’ পাঠিয়ে অন্য আরো অনেক Ethnic Group-কে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া চলমান কিনা? গাজায় বোমার আঘাতে একজন মানুষ মারা গেলে আপনি যতখানি কষ্ট পাচ্ছেন, ভারতের বিহার ও অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে এসে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বা বিহারীদের যখন পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, সেই আপনিই তখন উল্লসিত হচ্ছেন কিনা? গাজার একেকটা বাড়ি যখন বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হছে তখন ঠিক যতখানি আঘাত আপনিও অনুভব করছেন, ততখানি আঘাত এদেশের হিন্দুদের বাড়ি পুড়লে কিংবা বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস হলে অনুভব করেন কিনা? গাজা বা জিনজিয়াং-এর মুসলিমরা নির্যাতিত হলে যতখানি ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়, রাষ্ট্রীয় পরিচয়বিহীন রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ততখানি ভ্রাতৃত্ববোধ কাজ করে কিনা? উত্তরগুলো আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। কারণ সবখানেই মানুষ মরছে, মনুষ্যত্ব লুটোপুটি খাচ্ছে ধূলায়। আর নির্বিচারে মানুষ হত্যা ‘মানবতা’র বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অপরাধ, তা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক।
আরাফাত রহমান নোমান
প্রভাশক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়






No comments