মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাসঃ উৎপত্তি ও বিকাশ
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, রোজ সোমবার, মিয়ানমারের জেনারেল মিং অং এর নেতৃত্বে একটি রক্তপাতহীন সামরিক সামরিক ক্যু পরিচালিত হয়। অভ্যুত্থানে মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেতৃ অং সান সুচিকে তার বয়োজোষ্ট নেতৃবৃন্দসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক কারন হিসেবে সামরিক জান্তা মিং অং বর্তমান মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টিকে তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, এই সাধারন নির্বাচনে সামরিক সমর্থিক দল USDP ও সুচির NLD পার্টি সরাসরি অংশগ্রহন করেন, এবং নির্বাচনে সুচির দল পুরোই বাজিমাত করে অধিকাংশ আসনে নির্বাচিত হন। কিন্তু এই সম-প্রতিযোগিতায় সামরিক সমর্থিক পার্টির পরাজয়কে সামরিক জান্তা মিং মেনে নিতে পারে নি। তাই নির্বাচনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা অতীতের মত আরো একবার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন।
২০১৫ সালের যে জাতীয় নির্বাচনটি হয়েছিল সেখানে অংসান সুচির দল সরকার গঠন করতে পারলেও সেনাবাহিনী সমর্থিত দল Union solidarity and Development Party (USDP) ও তেমন একটা পিছিয়ে ছিলনা। কিন্তু সর্বশেষ ২০২০ নির্বাচনে এই দুই দলের মধ্যে সুচির দল NLD অনেকগুন বেশি আসন জিতে সরকার গঠন করেছিল। নির্বাচনের পর প্রায় মাস খানেক পর্যন্তও সামরিক বাহিনী দেশের সংবিধানকে মেনে চলছিল- কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সামরিক জান্তা আবার মার্শাল আইন জারি করেন পাশাপাশি দেশব্যাপী একবছরের জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন।
অনেক বিশ্লেষক এই অভ্যুত্থানকে পূর্ববর্তী সামরিক শাসনের একটি ধারাবাহিকতা বা লিগাছি হিসেবে উল্লেখ করতে চান- আবার অনেকে বর্তমান সামরিক অভ্যুত্থানের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে আরো বেশী সাবধনতা অবলম্বনের কথা বলেছেন। অতএব, আমাদের আজকের পর্বে আমরা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করব কেন আবারো মিয়ানমারে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা হল? বর্তমান ক্যুয়ের সাথে কি ঐতিহাসিক সামরিক শাসনের কোন লিগাছি বা সম্পর্ক আছে কি না?
আমরা জানি, অং সানের নেতৃত্বে NLD দল দীর্ঘ ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক মিয়ানমার জনগনকে উপহার দিতে আপোষহীন সংগ্রাম করেছে। কিন্তু বর্তমান অভ্যুত্থান কেন হয়েছে বা মিয়ানমারের সামরিক ইতিহাস কিভাবে চলমান মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণ? এর উত্তরে আমাদের একদম প্রথম থেকে শুরু করতে হবে- অর্থাৎ মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে।
মিয়ানমারের সামরিক শাসনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের জাতীয়তাবাদী নেতা ইউ নু’র প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল Anti-Fascist Peoples Freedom League (AFPFL) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সহযোগিতা নিয়ে অবৈধ জাপানি দখলদারিত্বকে প্রতিহত করে বার্মাকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং AFPFL দলের সমন্বয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করেন।
![]() |
| General Ne Win |
১৯৫৮ সালে যখন AFPFL দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয় এবং দলের চিফ অব স্টাফ নে উইনকে অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীত্ব দেয়া হয়। ঠিক তখন থেকেই মিয়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। উল্লেখ্য, যখন ১৯৪৯ সালে নে উইনকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ করা হয়েছিল-তিনি সুকৌশলে সম্পূর্ণ সামরিক বাহিনীর উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছিলেন। তিনি সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশের মধ্যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, এবং অনেকখানি সফল হয়েছিলেন, এবং এই মতাদর্শকে পুজি করে দেশের মধ্যকার ডানপন্থী দলগুলোকে কোনঠাসা করে ফেলার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
১৯৬০ এর নির্বাচনে ডানপন্থী দল থেকে ইউ নু বিজয়ী হন এবং নে উইন ক্ষমতা থেকে সরে আসেন। অতঃপর দুইবছর বাদেই একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নে উইন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেন। অভ্যুত্থানের পরে নে উইন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে Socialist Program Party (SPP) কে একমাত্র বৈধ দল হিসেবে ঘোষণা করেন এবং থেরাবাদ বুদ্ধিজম ও সমাজতন্ত্রকে মিশিয়ে একটি ধর্মীয়-উগ্রবাদ সম্পন্ন সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন।
ক্ষমতা গ্রহনের সাথে সাথে নে উইন পরবর্তী দুই দশক যাবত মিয়ানমারের জন্য বিচ্ছিন্ন নীতি গ্রহন করেন- অর্থাৎ বহিঃর বিশ্ব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটান। যেমনঃ
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে জাতীয়করণ;
স্বাধীন গণমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করলেন ,শুধু কিছু সরকার সমর্থিত মিডিয়া ছাড়া;
সার্বিক চিকিৎসা সেবাকে ফ্রি ঘোষণা করেন;
বিদেশিদের মিয়ানমার হইতে বিতাড়িত করেন; এবং
সকল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীদের বন্দী করেন।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাষ্ট্রকাঠামোয় নে উইনের এই একপাক্ষিক পরিবর্তনের জন্য পরবর্তীতে মিয়ানমারকে কিন্তু চরম খেসারত দিতে হয়েছে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পরেছে, মুদ্রাস্ফিতীর হার চরম মাত্রায় পৌছেছে, বাজার ব্যবস্থায় অবৈধ সম্পদের ছড়াছড়িতে জন-জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। এর ফলে ১৯৮৭ তে দেশব্যাপী সামরিক সরকার বিরোধী এক বিশাল আন্দোলন হয় এবং পরবর্তীতে তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, বৌদ্ধ সাধক, শ্রমিক সবাই একত্রে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার কাছে সে বিদ্রোহ টেকেনি বেশি দিন। প্রায় কয়েক হাজার আন্দোলনকারী এই দাঙ্গায় মারা, যার মধ্যে সামরিক সমর্থিত দলের সদস্যও ছিলেন।
১৯৮৮ সালে সামরিক জান্তা নে উইন ক্ষমতা থেকে স্বেচ্ছায় সরে পড়েন। কিন্তু গার্ডিয়ান পত্রিকার ভাষ্যমতে, তার শাসনকালে মিয়ানমারের অর্থনীতি এতটাই নিচে চলে গিয়েছিলো যে স্বয়ং জাতিসংঘ মিয়ানমারকে বিশ্বের কয়েকটি অনুন্নত দেশের প্রথম সারিতে রেখেছিল। জেনারেল সো মুয়াং নে উইনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় গিয়ে তিনি নে উইন জনগনের সামনে সেনাবাহিনীর যে পরিমান মানহানি ঘটিয়েছিল তা প্রশমনে বেশ কিছু সংস্কারনীতি গ্রহণ করেন। ঠিক এই সো মুয়াং এর সমসাময়িক সময়ে অং সান সুচি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রতিহত করতে National League For Democracy (NLD) গঠন করেন।
১৯৮৯ সালে বার্মা নামটির বদলে দেশের নাম মিয়ানমার করা হয় এবং রাজধানী রেংগুনের নাম দেয়া হয় ইয়াংগুন (এখন রাজধানী নাইপেদো)। NLD র জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে সো মোয়াং বাধ্য হয়ে দলের নেতা অং সান সুচিকে গৃহবন্দী করে রাখার হুকুম দেন পাশাপাশি NLD সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্থার কণ্ঠরোধ করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৯০ সালে সংবিধান কমিটির প্রণীত নতুন সংবিধান অনুযায়ী দেশব্যাপী নির্বাচনের আয়োজন করা হয়, এবং সেই নির্বাচনেও সুচির NLD পার্টি সংসদের বেশিরভাগ আসনে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনে সুচির NLD পার্টি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির একতরফা সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই সামরিক জান্তা মোয়াং জনগনের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হননি- উপোরন্ত নির্বাচনটাকে বাতিল ঘোষণা করেন। ঠিক তখন থেকেই আং সান সুচি আন্তর্জাতিক মহলে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে বৈদেশিক চাপ ও সেনাবাহিনীর নিজের ইমেজকে ইতিবাচক রাখতে সেনা জান্তা মোয়াং, সুচিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এর বিপরীতে NLD’র অসংখ্য নেতৃবৃন্দদের বন্দী করে রাখা হয়।
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই সুচির রাজনৈতিক দল NLD কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোট- যেমনঃ জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান প্রভৃতি সমর্থন দিতে থাকে এবং দেশব্যাপী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপর বার্মিজ সেনাবাহিনীর যে মানবাধিকার লংঘন তার নিন্দা করতে থাকে।
২০০৭ সালে দেশে দ্রব্যসামগ্রী ও জ্বালানির উচ্চমূল্য বৃদ্ধির ফলে আবারো দেশব্যাপী সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মুল প্রাণ শক্তি ছিল বৌদ্ধ সাধকদের সামরিক শক্তির বিপক্ষে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া- ইতিহাসে এই বিপ্লব “সাফরোন বিপ্লব” নামে পরিচিত। ২০০৯ সালে অং সানকে এই বিপ্লবের মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে আবারো তাকে গৃহবন্দী করা হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলের চাপে জান্তা মিয়ানমারের জন্য নতুন সংবিধান রচনার প্রস্তাব দেন। এ পর্যায়ে সেনাবাহিনী একটি চুক্তি করেন NLD দলের সাথে। সেখানে কিছু শর্ত পুরনের বিনিময়েই নতুন সংবিধানের আলোকে মিয়ানমারে নির্বাচন আয়োজনের কথা দেন যেমনঃ সংবিধানের এক-চতুর্থাংশ আসন সামরিক সমর্থিত দলের জন্য রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে তাদের অধিষ্ঠিত করতে হবে এবং NLD দলের প্রধান সুচি নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারবে না।
যাইহোক, ১৯৯০ সালের প্রায় ২০ বছর পর আবারো মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং একতরফাভাবে সামরিক সমর্থিত দল USDP নির্বাচনে বিজয়ী হন। NLD সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এটাকে একটি কারচুপি পূর্ণ নির্বাচন হিসেবে উল্ল্যেখ করেন। আন্তর্জাতিক চাপে পরে সামরিক জান্তা দীর্ঘ ১৪ বছর পর গৃহবন্দী সুচিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ২০১৫ নির্বাচনে সুচির দল অংশ নেন এবং বিপুল ভোটে দীর্ঘ ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন ঘটান। যদিও বেশিরভাগ একাডেমিক এটাকে পূর্ণ গণতন্ত্র না সেমি-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে উল্ল্যেখ করেন।
NLD সরকার ক্ষমতায় বসার পর সবচেয়ে আনন্দিত হয়েছিল দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো। দীর্ঘদিন সেনা শাসকদের নির্যাতনে তাদের জনজীবন বিষণ্ণ হয়ে পরে, যেখানে সুচির দলের ক্ষমতার উত্থান তাদের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বসবাসের পরিবেশকে নিশ্চয়তা দেয়। সুচি ক্ষমতায় গিয়ে সামরিক শাসকদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপর চালানো গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে দায়ী করতে থাকেন, এবং এই মানবতা বিরোধীর কার্যক্রমের দরুনই যে দেশজুরে অসংখ্য সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গড়ে ওঠে তা দেশব্যাপী প্রচার করেন। সুচির সামরিক শক্তির বিপরীতে এই যে পদক্ষেপ তা অনেক ক্ষেত্রে এই অভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন।
যাইহোক, এই ছিল আজকের পর্বের আলোচনা। আশা করি আপনারা এই লেখার মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক শাসনের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হলেন। পরবর্তী পর্বগুলোয় আমরা এই অভ্যুত্থানকে নিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক আচরণে কি কি প্রভাব ফেলবে? রোহিঙ্গা ইস্যুতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গনতন্ত্র বজায় রাখতে, প্রতিবেশিদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে তা আলোচনা করব। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। ধন্যবাদ।
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




No comments