চীন- হংকং সম্পর্কে সংকট ও এক দেশ দুই নীতি পলিসি
![]() |
| Chinese Hong Kong: One state Two plicy |
হংকং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের এক বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল। ম্যানডারিন ভাষায় হংকংকে শিয়াংকাং বলা হয়। এর উত্তরে চীনের কুয়াংতুং প্রদেশ এবং পূর্ব, পশ্চিম এবং দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগর। প্রথম আফিম যুদ্ধে ব্রিটিশদের নিকট চিং সম্রাজ্যের পরাজয়ের পর নানকিং সন্ধি চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা হংকং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়
যার ফলস্বরূপ হংকং চীনের মূল ভূখণ্ডের অংশ হওয়া সও্বেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
এক দেশ দুই নীতি
এক দেশ দুই নীতি হচ্ছে হংকংকে চীনের নিয়ন্ত্রণধীনে রাখার এক সাংবিধানিক পদ্ধতি। ১৯৮০ এর দশকে চীনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দেং জিয়াও পিং এ নীতির উদ্যোক্তা। ১৯৮৪ সালে চীন এবং ব্রিটেন হংকং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কালে যৌথ ঘোষণা পত্র স্বাক্ষর করে। যেখানে হংকং এর নিজস্ব অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং. বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বীকার করা হয় পাশাপাশি প্রতিরক্ষা এবং কূটনৈতিক বিষয় বেইজিং এর নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার কথা নিশ্চিত করা হয়।
প্রেক্ষাপটঃ
প্রাচীনকালে হংকং চীনের প্রদেশ ছিল। ১৮৪১ সালে প্রথম আফিম যুদ্ধ সংঘটিত হয় যেখানে ব্রিটেনের নিকট চিং সম্রাজ্যের পরাজয়ের মাধ্যমে নানকিং চুক্তি (১৮৪২) অনুযায়ী হংকং আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশদের অধিকারে আসে। সেই ১৮৪২-১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫৫ বছর হংকং ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় যখন উপনিবেশিক শাসনের বিলুপ্ত ঘটতে থাকে তখন ব্রিটেন নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে ইয়ং প্লান প্রস্তাবসহ বেশ কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তন নিয়ে আসে যার ফলস্বরূপ হংকং উপনিবেশিক শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্রের স্বাদ পেতে শুরু করে। অন্যদিকে ১৯৪৯ সালে চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে রাজনৈতিক ও অথনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে হংকংয়ে চীনা শরনার্থী আসতে শুরু করে যাদের দক্ষতা, মূলধন এবং বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের আগমন হংকংকে শিল্প এবং উৎপাদনমুখী শহরে পরিণত করে।
মৌলিক আইনঃ
হংকং এর মৌলিক আাইনের ভীত রচিত হয় চীন এবং ব্রিটেনের যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরের মাধ্যমে। ঘোষণা পত্র অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পরবর্তী সময়ে চীনের নিকট হংকং হস্তান্তর করা হবে প্রসিডেন্ট দেং জিয়াও পিং এর প্রস্তাবিত নীতির মাধ্যমে। এখানে উল্লেখ করা হয় ২০৪৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ পরবর্তী ৫০ বছরে অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রা প্রণালীতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই মৌলিক আইন হচ্ছে হংকংয়ের ক্ষুদ্র সংবিধান। সংবিধানের সকল নীতিমালার খসড়া ৫৯ জন সদস্যের দ্বারা প্রণীত হয় যেখানে ২৩ জন সদস্য হংকংয়ের এবং বাকিরা চীনা। এখানে হংকং এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সম্পর্ক এবং মানবাধিকার রক্ষার বিষয় উল্লেখ করা হয়। ১৯৮৮ সালে এ কমিটি প্রথম খসড়া প্রণয়ন করেন এবং ১৯৮৯ সালে খসড়া সংবিধান প্রকাশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৪ এপ্রিল হংকং এর জন্য মৌলিক আইন গৃহীত হয়। ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই হংকং এর জন্য গৃহীত মৌলিক আইনটি কার্যকর হয়।
আন্দোলনসমূহঃ
এক দেশ দুই নীতি ব্যবস্থার প্রবর্তন সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে যেখানে হংকংয়ের স্থানীয়রা তাদের সরকারকে বেইজিং এর পুতুল সরকার বলে মনে করছেন। এতে অনেক হংকংবাসীই স্বাধীনতার দাবি তুলেছে। এরই মধ্যে মাত্রদুই দশকে সংঘটিত বিক্ষোভ সমূহঃ
umbrella movement:
এটি একটি রাজনৈতিক প্রতীকী আন্দোলন যা ২০১৪ সালে গণতন্ত্রের প্রতিবাদে হয়। এ আন্দোলনে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষ হংকং এর রাস্তায় নেমে আসে যেখানে প্রতিবাদের মূল বিষয় নির্বাচন ও বাক স্বাধীনতা। এ আন্দোলন ৭৯ দিন স্থায়ী ছিল যদিও এর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অবিচার এবং অবৈধতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং অধিকতর নিপীড়নের দিকে পরিচালিত হয়।
অপরাধী প্রত্যপর্তন আইনঃ
সম্প্রতি ২০১৯ সালের জুনে হংকংয়ে চীনা বিরোধী সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ দেখা যায়। বিক্ষোভের সূত্রপাত তাইওয়ানে ছুটি কাটাতে গিয়ে অন্তঃসও্বা বান্ধবীকে হত্যা করার অভিযোগ যখন এক হংকং বাসীর বিরুদ্ধে ওঠে। যেহেতু তাইওয়ান এর সাথে কোনো বন্দী বিনিময় চুক্তি নেই সেই প্রেক্ষিতে হংকং থেকে চীন ও তাইওয়ানে অপরাধী প্রত্যপর্তন সংক্রান্ত একটি বিল প্রস্তাব আনা হয় আর এ আইনের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ৯ জুলাই প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ হংকং এর রাজপথে নেমে আসে। মূলত হংকং এর সাধারন মানুষ বেইজিং এর দুর্বল আইন এবং মানবাধিকার রেকর্ডের কারণে আস্থা রাখতে পারে নি। তাদের বক্তব্য, বিলটি পাশ হলে হংকং এর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীন হস্তক্ষেপ করবে। পরবর্তীতে প্রবল চাপের মুখে হংকং এর চীনপন্থী শাসক ক্যারী ল্যাম এ আইনটি বাতিল করতে বাধ্য হন।
জাতীয় নিরাপত্তা আইনঃ
২০২০ সালের ৩০ জুন চীন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে হংকংয়ে বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল নামে জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাশ করে। যেখানে পুরো বিশ্বে হংকংয়ের সমাপ্তি বলে মন্তব্য করা হচ্ছে। এই বিশেষ আইনের অধীনে হংকং এবং চীনের মধ্যে যে নীতিমালা ছিলো তা শেষ হয়ে যাবে। নিরাপত্তা আইনটি অতি গোপনীয়তার সাথে ৬৬ অনুচ্ছেদের অধীনে পাশ করা হয়। এই আইন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় ৩০ জুন। হংকং এর ২৩ তম বাষিকীতে এই আইন চালু করা হয়। নিটাপওা আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত বিষয়সমূহঃ
(১) চীন সরকারের কোনো রকম আলোচনা বিদ্রোহের সামিল।
(২) কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেনঞ্জ করা।
(৩) মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা ভয় প্রদর্শন সন্ত্রাসবাদ বলে বিবেচিত হবে।
উপরোক্ত অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ দন্ডনীয় অপরাধ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এই নতুন আইনের মূল বিধান গুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
১) সন্ত্রাসবাদ, উপদ্রব, বিচ্ছিন্নতা এবং বিদেশী সংস্থার সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ব্যক্তির সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হবে।
২) দোষী সাব্যস্তদের পাবলিক অফিসে দাঁড়াতে দেয়া হবে না।
৩) গণপরিবহনের কোনোরকম ক্ষতিসাধন সন্ত্রাসবাদ বলে বিবেচিত হবে।
৪) আইনের আওতাধীন দোষী সাব্যস্ত হলে সংস্থাগুলোকে জরিমানা করা যেতে পারে।
৫) চীন সরকার তাদের নিজস্ব সদস্যদের নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করবে। একইভাবে হংকংকে জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন গঠন করতে হবে যার পরামর্শদাতাকে চীন কেন্দ্রীয় সরকার নিয়োগ দিবে।
৬) হংকং এর প্রধান নির্বাহী বিচারকদের জাতীয় সুরক্ষা মামলার শুনানি করার জন্য বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হবে।
৭) তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আইনটি কিভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত সে বিষয়ে বেইজিং এর ক্ষমতা থাকবে এবং আইনটি হংকং এর যেকোনো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে, বেইজিং এর আইনটি অগ্রাধিকার পাবে।
৮) আইন ভঙ্গ করতে পারে এমন সন্দেহজনক ব্যক্তিদের wire-tap করে নজরদারি করতে পারবে।
৯) এ আইনটি হংকংয়ে স্থানীভাবে বসবাসকারী কিন্তু হংকং এর বাসিন্দা নয় তাদের জন্যও প্রয়োজ্য।
পরিশেষে বলা যায়, হংকংবাসী মনে করছে 'এক দেশ দুই নীতি' এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চীন এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রস্তুতি শুরু করেছে। যার প্রমাণস্বরূপ হংকং হস্তান্তরের মাত্র ২৩ বছরে একাধিক বিক্ষোভ চীনের প্রতি হংকংবাসীর প্রবল অসন্তোষ প্রকাশ করে। হংকংবাসী স্বপ্ন দেখছে চীন থেকে আলাদা স্বাধীন হবার যেহেতু তারা বহুদিন ধরে চীন হতে ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করছে। তবে ২০৪৭ সালের পরবর্তী সময়ে হংকং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে এ নিয়ে রয়েছে প্রবল দুশ্চিন্তা।
মোহাম্মদ রায়হান মিয়া
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




No comments