ভারতীয় কাউন্সিল আইন,১৯০৯ বা মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন,১৯০৯
ভারতীয় কাউন্সিল আইন,১৯০৯ বা মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন,১৯০৯
ভূমিকা:-
ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক অগ্রগতিতে মর্লি মিন্টোর সংস্কার আইন (১৯০৯) একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ এই আইনের মাধ্যমে ভারতীয়দের শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই নয় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ও সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৮৬১ এবং ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন কোন না কোনভাবে ভারতীয়দের ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করতে সচেষ্ট হয়েছে। ১৯০৬ সালে আগা খার নেতৃত্বে একদল মুসলমান নেতা বড়লাট লর্ড মিল্টোর সাথে দেখা,করে মুসলমানদের জন্যে আলাদা নির্বাচনের দাবি জানায়। লর্ড মিল্টো তাদের দাবী মেনে নেন। আসলে ইংরেজ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসের আন্দোলনকে দূর্বল করে দেয়া। লর্ড মিল্টোর আশ্বাসের পর মুসলিম নেতারা ঢাকাতে এসে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে সমগ্র ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণা করলে ইংরেজ সাম্রাজ্যের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে ইংরেজ সরকার মার্লে-মিন্টো সংস্কার আইন প্রবর্তন করেন।
তবে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন পূর্ববর্তী আইনগুলোর তুলনায় ছিল এক বিরাট অগ্রগতি। এ আইন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের সকল সম্প্রদায়ের বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-গুলোর মধ্যে বিরাট আশার সন্চার করেছিলো। মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ও সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়।
১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন বা মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন পাশের কারণসমূহ –
১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন বা মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন প্রবর্তনের পশ্চাত্তে বিভিন্ন কারণ বা উপাদান কাজ করছিল। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোশনা করা হল:-
১।১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের ব্যর্থতা:-১৬৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল বা পরিষদ আইনকে একটি সাংবিধানিক মাইলফলক হিসাবে উল্লেখ করা হলেও, এ আইন ভারতীয়দের আশা-আকাক্ষা পূরণ করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। এ আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রে ও প্রদেশে যে আইন পরিষদ গঠন করা হয়, তা ছিল প্রকৃতপক্ষে এক ভুয়া আইন পরিষদ। আইন পরিষদগুলোর গঠনরীতি ও কার্যক্রম ভারতীয়দের মনে হতাশার সন্চার করে। এসব পরিষদে নগন্য সংখ্যক ভারতীয় সদস্যই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারের সিদ্ধান্তের উপর আইন পরিষদের প্রভাব ছিল খুবই কম। ১৮৯২ সালের আইন তথাকথিত “ নির্বাচনের ধারন” ভারতীয়দের মোটেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি।আইন পরিষদে বেসরকারি সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি ছিল সরকারি একটি ছলনা মাত্র। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অধিক সংস্কারের প্রতাশায় আন্দোলন করলেও ব্রিটিশ সরকার ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। ব্রিটিশ সরকারের ঐ উদাসীন মনোভাব ভারতীয়দের ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে দেশ ব্যাপী রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠে।
২।দুর্ভিক্ষ ও মহামারি রোগে সরকারের অবহেলা:-১৮৯৬-৯৭ সালে ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের মারাত্বক দুর্ভিক্ষ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটে। সরকারি হিসেবমতে, প্রায় ১ লক্ষ ৭৩ হাজার লোক এ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ ইত্যাদির ফলে ভারতীয়দের দুঃখদুর্দশা চরমে উঠলে ও, ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ কোন প্রতিবিধানের প্রশেষ্টাই করেনি। এর ফলে ১৮৯৯ সালে ভারতপ প্রচুন্ড খরা শুরু হয়। জনগন তাদের দুঃখকষ্টের জন্য সরকারের ভ্রান্ত আর্থিক নীতিকে দায়ী করে। সরকার মহামারী মোকাবেলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জনগনের দুঃখদুর্দশা মোচনে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এ কারনে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বিদ্বেষ ধূমায়িত হতে থাকে।
৪।লর্ড মিন্টোর শাসনামলে রাজনৈতিক অস্থিরতা:- ১৯০৫ সালের নভেম্বর মাসে লর্ড কার্জনের পর লর্ড মিন্টো ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় নিযুক্তু হন। এ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি কঠিন রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হন। তিনি জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখতে পান। বঙ্গভঙ্গের অব্যহতি ফল হিসেবে সৃষ্টি আন্দোলনমুখী গণশক্তিকে তিনি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত করতে সচেষ্ট ছিলেন।ডিনি তাদের সন্তোষ্ট করার উদ্দেশ্যে অধিকতর সংবিধানিক অগ্রগতি আপোষ,আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ ক্ষেত্রে মিন্টো কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে মধ্যপন্থী নেতৃবৃন্দের উপর বেশি নির্ভর করেন।
৫।নতুন শক্তি হিসাবে কংগ্রেসের উদ্ভব:- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রস ছিল তৎকালীন একটি নতুন শক্তি। এ ক্ষেত্রে ভারত সচিব হিসাবে মর্লি লর্ড মিন্টোকে সতর্ক করে বলেন যে, নতুন শক্তি হিসাবে কংগ্রেসের উন্থানের কারণে এখন আর আগের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শাসন পরিচালনা সম্ভব হবেনা। কংগ্রেস দল ও কংগ্রেসনীতির সাথে বুঝাপড়ার চেষ্টা অবিলম্বে করতে হবে। নতুবা শীগ্রই ভারতীয় মুসলিমরাও কংগ্রেসে সামিল হতে পারে এবং ইংরেজদের বিরোধিতা তীব্রতর হতে পারে। তাই অবস্থা তাদের বাহিরে চলে যাওয়ার আগে এবং মুসলিম নেতারা নেতারা হতাশা বশতঃ কংগ্রেসে চলে যাবার আগে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
৬।কংগ্রেসে চরমপন্থি গোষ্ঠীর উদ্ভব:-তৎকালীন সময়ে ভারতে কংগ্রেসের পতাকার নিচে একটি চরমপন্থি গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে। সরকারের চরমপ্রতিক্রিয়াশীল ও নিপীড়নমূলক নীতির ফলে এ গোষ্ঠীর জন্ম হয়। এ গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ মনে করেন যে,সংগ্রাম, আত্বত্যাগ ও সক্রিয় আন্দোলন ছাড়া স্বরাজ লাভের বিকল্প কোনো পথ নেই। কিন্তু তখন ও পর্যন্ত মডারেটরা ব্রিটিশ সরকারের ন্যায়বিচার নীতি ও ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ব্রিটিশ সরকার দ্বারা পূরণ হওয়ার আশা রাখতেন। তাই চরমপন্থিরা কংগ্রেসের আপোষ ও আবেদননীতিকে তীব্র ধিক্কার জানান। নবোদিত চরমপন্থিরা প্রধানকে বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারেী কাছ থেকে দাবি আদায়ের জন্য তৎপর হন।বঙ্গভঙ্গের পর থেকেই চরমপন্থি বা আপোষ বিরোধীরা কংগ্রেসে প্রভাব বিস্তার করেন। উগ্রপন্থী বা চরমপন্থিদের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে জ্বালাময়ী বক্তাতা তাদের আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করে,তুলে। ফলে ব্রিটিশ সরকার কিন্ত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হন।
৭।সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব:- চরমপন্থি শক্তির পাশাপাশি ভারতে অপর একটি শক্তি জেগে উঠে।সন্ত্রাসবাদ ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অপর একটি শাখা ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসবাদীদের রীতিমত ভয় করতেন। সন্ত্রাসবাদের উদ্ভবের কারন হিসাবে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের প্রচুন্ড দমন নীতি প্রধানত দায়ী ছিল। ১৯০৭ সাল হতে বাংলায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী হামলা সংঘটিত হতে থাকে। ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের কাছে চরমপন্থি সন্ত্রাসবাদীরা বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরেী ট্রেন উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে যদিও ব্যর্থ হয়। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।পূর্ব বাংলায় ছোট লাট ব্যাম্পফিল্ড ফুলারের অন্ধ দমননীতি, পশ্চিম বাংলায় ক্ষুদিরামের ফাঁসি এবং মুরারীপুকুর বোমা হামলা সন্ত্রাসবাদকে আরও উগ্রতর করে। মহারাষ্ট্রে তিলকের চরমপন্থি আন্দোলনের প্রভাবে সন্ত্রাসবাদ তীব্র হয়। ১৯০৭ সালে লালা লাজপৎ রায় ও অজিত সিংহের নির্বাসন সন্ত্রাসবাদকে মরিয়া করে তোলে। তবে কেবলমাত্র রাজনৈতিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা সমাধান করা সম্ভব ছিল। কিন্তু অর্থনেতিক অসন্তোষ সন্ত্রাসবাদকে দফায় দফায় খুঁড়িয়ে তোলে।
৮।অর্থনেতিক অবস্থার অবনতি:-এ সময়ে ব্রিটিশ ভারতে অর্থনৈতিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটতে থাকে। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে দারুন মন্দভাব পরিলক্ষিত হয়। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকদের মজুরির হারের ছাঁটাই, ১৮৯৬-৯৭ সালপর ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ এবং ১৮১৯ সালে প্লেগ মহামারিতে বহু লোকের জীবন ক্ষয়ের ফলে জনসাধারণের মনে গভীর হতাশা দেখা দেয়। জনসাধারণের সমস্যার প্রতি সরকারের অবহেলা, উদাসীনতা ও মৌনতা ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগ্রত করে।
৯।রুশ-জাপান যুদ্ধের প্রভাব:- ১৯০৫ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধ সংঘটিত হয়।এ যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপান জয়লাভ করে।জাপানের বিজয় ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। এবং সমগ্র এশিয়ার জন্য এক নতুন,যুগের সূচনা করে। বিশেষ করে জাপানের সাফল্য এবং রাশিয়ার পরাজয়ের ফলে এশিয়াবাসী তথা ভারতীয়দের মনোবল বৃদ্ধি করে এবং তাদের মধ্যে গভীর জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতাশা,দক্ষিন আফ্রিকায় ভারতীয়দের উপর বর্ণবৈষম্যমূলক নিপীড়ন,মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সরকারের পক্ষে রাখার প্রয়াস সহ বিভিন্ন ঘটনা,১৯০৯ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়নে ভুমিকয় রেখেছে।
১৯০৯ সালের ভারত শাসন আইন,সাংবিধানিক সংস্কার ও আইন।
লর্ড মিন্টো ভারতে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। লর্ড মর্লি ভারতে কি ধরনের শাসন সংস্কার প্রবর্তন করা দরকার তা নির্ধারন করার জন্য একটি” পার্লামেন্টারি কমিশন” নিয়োগের কথা বলেন। কিন্তু র্ড মিন্টো চান যে, পার্লামেন্টারি কমিশনের বদলে বলেন তিনি,ভারত থেকে শাসন সংস্কারের জন্য খসড়া প্রস্তাব পাঠাতেন। মিন্টো আইন পরিষদগুলোকে ভারতের নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাবৃদ্ধির বিষয় বিবেচনার জন্য স্যার এ. টি অরজেলের নেতৃত্বে একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করেন, যেটি ( আরজেল কমিটি নামে পরিচিত) ভারত সরকার সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব। কারন উল্লেখ ব্রিটিশ কতৃপক্ষের নিকট ও প্রেরণ করে। তাতে বলা হয় যে, ভারতে রাজনৈতিক চেতনা এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের শাসন কার্যে রাজনৈতিক মতামত গ্রহণ না করে পারা যাবেনা।
ভারতে সাংবিধানিক অগ্রগতির বান্ছনীয়তার প্রশ্নে ভাইসরয় লর্ড মিন্টো এবং ভারত সচিব লর্ড মর্লির দীর্ঘ সময় ধরে পত্রলাপ চলে। লর্ড মিন্টো কংগ্রেসের মডারেটদের বাদ দিয়ে দেশীয় রাজা ও উচ্চবিত্ত মুসলিম নেতাদের দ্বারা একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের জন্যে ভারত সচিব লর্ড মর্লির আহবান করলে, মর্লি এতে অসম্মতি প্রকাশ করেন।মর্লি বলেন, এ ধরনের সরকারি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন অপেক্ষা আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া ভারতীয় মডারেট ও মুসলিম নেতাদের সহযোগিতা,লাভ জরুরি। তিনি প্রস্তাববিত মতামতের জন্যে ভারতের প্রাদেশিক সরকারগুলোয় প্রেরণ করেন।
এসব কিছুর আলোকে ১৯০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর মর্লি লর্ডসভায় বিখ্যাত ভারতীয় পরিষদ বিলটি উপস্থাপন এবং ব্যাখ্যা করেন। ১৯০৯ সালের ২ য় মে বিলটি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অনুমোদিত হলে, তা আইনে পরিণত হয়। এ আইনই ১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল বা পরিষদ আইন নামে পরিচিত। এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেহেতু ভারত সচিব লর্ড মর্লি এবং মিন্টোর মুখ্য ভূমিকা ছিল সেহেতু এ আইনকে মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন নামে অভিহিত করা যায়।
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের বৈশিষ্ট বা ধারাসমূহ:-
১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন ছিল এক সংশোধনী আইন। এটা তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি।
ক,কেন্দ্রিয় আইন পরিষদ গঠন:-
১৯০৯ সালের আইনের দ্বারা কেন্দ্র বড়লাটের আইন পরিষদের গঠন সম্পর্কে বলা হয় যে,
এ আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রিয় আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়।
কেন্দ্রে আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়।
এ আইনে ৬৯ জনের মধ্যে ৩৭ জন সরকারি এবং ৩২ জন বেসরকারি সদস্য হবেন বলে উল্লেখ করা হয়।
৩৭ জন সরকারি সদস্যের মধ্যে গভর্নর জেনারেল ও তাঁর পরিবার বর্গসহ ৯ টি স্থায়ী পদ ধরা হয়। বাকি ২৮ জন সরকারি সদস্যকে বড়লাট মনোনয়ন করার অধিকর পান।
৩২ জন বেসরকারি সদস্যের মধ্যে ৫ জন গভর্নর জেনারেল দ্বারা মনোনিত হবেন বলে উল্লেখ করা হয়।
অবশিষ্ট ২৭ জন বেসরকারি সদস্য নির্বাচিত হবেন বলা হয়।
২৭ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে ১৩ জন বোম্বাই,মাদ্রজ,বাংলা, উত্তর প্রদেশ প্রভৃতি প্রদেশের আইন সভায় বেসরকারি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন বলা হয়।
এবং বাকি ১৪ জন নির্বাচিত সদস্য বলা হয়।
খ. প্রাদেশিক আইন পরিষদ গঠন:-
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনে প্রাদেশিক আইন পরিষদের গঠন সম্পর্কে বলা হয় যে,-
এ আইনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
বড় বড় প্রদেশ যেমন:- বাংলায় ৫২ এবং বোম্বাই,মাদ্রাজ,উত্তর প্রদেশ প্রভৃতি প্রতিটি প্রদেশের আইন পরিষদের ৪৭ জন সদস্য রাখার বিধান করা হয়।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশের আইন পরিষদে সর্বাধিক ৩০ জন অতিরিক্ত সদস্যবথাকার ব্যবস্থা করা হয়।
প্রদেশের আইন পরিষদে বেসরকারি সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়া হয়।কিন্ত বেসরকারি নির্বাচিত সদস্যরা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলনা।
প্রাদেশিক আইন পরিষদগুলোকে সরকারি সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবসান ঘটানো হয়। কিন্তু সেখানে সরকারি ও বেসরকারি সদস্যরা মিলিতভাবে নির্বাচিত সদস্যদের উপর সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন।
যেমন, মাদ্রাজ আইন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বেসরকারি সদস্য এবং ২১ জন ছিলেন সরকারি সদস্য।
একমাত্র বাংলা প্রদেশই নির্বাচিত বেসরকারি সদস্যগণ সংখ্যা গরিষ্ঠতা ভোগ করেন।
গ। আইন পরিষদগুলোর ক্ষমতা ও কার্যের সম্প্রসারণ :-
১৯০৯ সালের ভারতীয় পরিষদগুলোর ক্ষমতা ও কার্যের কিছুটা সম্প্রসারণ করা হয়। যেমন:
জনস্বার্থ বিষয়াদি সম্পর্কে সদস্যদের প্রস্তাব উপস্থাপনের ক্ষমতা দেয়া হয়।
কতিপয় বিষয় যেমন:- রাজস্ব সংক্রান্ত শুল্ক কর, সরকারি ঋণ, প্রতিরক্ষা, দেশীয় শিল্প,রেলপথ, রাজনতিক পেনশন, ধর্মীয় সংক্রান্ত প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা বা প্রস্তাব উপ্থাপনের কোন অধিকার আইন পরিষদে নেই।
বেসরকারি সদস্যগণকে আয়-ব্যায়ের উপর অধিক ক্ষমতা দেয়া হয়,এবং সরকারি আয়-ব্যায় বা বাজেট সম্পর্কে প্রস্তাব উপস্থিত করতে পারবেন এবং তার উপর ভোট নেয়ার ব্যবস্থা ও ছিল। অবশ্য কতগুলো ব্যায় ভোটযোগ্য বলে বিবেচিত হতোনা। আবার ভোটাভুটির ব্যবস্থা থাকলেও ভারত সরকার যেকোনো ভোট ফলকে অগ্রাহ্য করতে পারত।
পূর্ব নোটিশ ছাড়া কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে বিভাগীয় মন্ত্রী বাধ্য ছিলেননা।সদস্যরা পরিষদে কোন নতুন প্রস্তাব পেশ করতে পারতেন। এ প্রস্তাব পাস করে সরকারের কাছে তা সুপারিশরূপে গণ্য হত। সরকার তা গ্রহণ করতে বাধ্য ছিলেননা। আইন পরিষদের সভাপতি কোন কারণ না দেখিয়ে সে প্রস্তাব পুরো বা আংশিক নাকচ করতে পারতেন।
প্রাদেশিক আইন পরিষদের ক্ষেত্রে ও কেন্দ্রের অনুরূপ বিধিগুলো প্রয়োগ করা হত। প্রাদেশিক সর্বোচ্চ শাসনকর্তা অনুরূপ বিধিগুলো প্রয়োগ করা হত। প্রাদেশিক সর্বোচ্চ শাসনকর্তা ওতাঁর শাসন পরিষদ প্রাদেশিক আইন পরিষদে গৃহীত যেকোনো প্রস্তাবকে গ্রহণ বা বর্জন করতে পারতেন। এমনকি, আইন পরিষদ কতৃর্ক প্রণীত যেকোনো আইনকে তাঁরা বাতিল করে নিতে পারবেন।
ঘ। গভর্নর জেনারেলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সম্প্রসারণ :-
১৯০৯সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেল কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। এ আইনে মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের নির্বাহী বা শাসন পরিষদের সদস্যসংখ্যা ২ জন থেকে বৃদ্ধি করে ৪ জনে উন্নীতকরণ ক্ষমতা “ সপরিষদ ভারত সচিব” কে প্রদান করা হয়।ভারত সচিবের অনুমতি সাপেক্ষ “সপরিষদ গভর্নর জেনারেল” কে অনধিক ৪ জন সদস্য নিয়ে বাংলার গভর্নরের কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
ঙ। গভর্নর জেনারেল কার্যনির্বাহী পরিষদে ভারতীয় অন্তর্ভুক্তি:-
এ আইনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম গভর্নর জেনারেলের কার্যনিষ্পাদক পরিষদে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এস পি সিনহা-কে গভর্নর জেনারেল কার্যনির্বাহী পরিষদে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
চ।নির্বাচনী নীতির স্বীকৃতি প্রদান :-
১৯০৯সালের আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নির্বাচনী নীতির স্বীকৃত প্রদান। মর্লি-মিন্টো আইনদ্বারা সর্বপ্রথম সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচন নীতিবা প্রথা চালু করা হয়।১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের সুপারিশের ভিত্তিতে মনোনয়ন প্রথার প্রবর্তন করা হয়েছিল, কিন্ত ১৯০৯ সালের আইন পরিষদের সদস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচনী নীতি স্বীকৃত হয়। তবে এ স্বীকৃতি আবার দু'টো উপাদান দ্বারা ছিল নিয়ন্ত্রিত।
ছ। সীমিত ভোটাধিকার :
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনে সদস্যদের ভোটাধিকার অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়। পৌরসভা,স্থানীয়বোর্ড,কিথ বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট,বণিক সমিতি, পেশা সংগঠন, ভূস্বামী ইত্যাদিই ভোটাধিকার লাভ করে। কেন্দ্রিয় আইন পরিষূের বেসরকারি নির্বাচিত সদস্যরা প্রাদেশিক আইন পরিষদ এবং বণিক সমিতি ও ভূস্বামীরা মত বিশেষ নির্বাচনী সংস্থার দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
জ। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন:
এ আইনে সর্বপ্রথম মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কারন, ব্রিটিশ ভারতে অবহেলিত মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল খুব বেশি।এর ফলে মুসলমান প্রতিনিধিগণ মুসলমনা ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হবার সুযোগ লাভ করেন।
ঝ। সংখ্যা সাম্যনীতি:
এ আইনের মাধ্যমে স্থির হয় যে, যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেসব প্রদেশের আইন পরিষদেগুলোতে মুসলমানরা নিজ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি আসন লাভ করবেন। কেন্দ্রিয় আইন পরিষদে মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার তুলনায় বেশি আসন অর্থাৎ, নির্বাচিত ভারতীয় আসনের এক তৃতীয়াংশ লাভ করবেন।
ঞ। প্রতিনিত্বশীল ব্যবস্থার ধারণা:-
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের অপর একটি বিশেষ অভিনবত্ব এই যে,এ আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতে সর্বপ্রথম প্রতিনিত্বশীল ব্যবস্থার ধারণা স্বীকৃত হয়।
মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের সীমাবদ্ধতা :
১৯০৯ সালেরমর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের দ্বারা কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটান হয়নি।বরং আইনটি ভারতের রাজনৈতিক জীবনে বড় জটিলতা সৃষ্টি করে। এ আইনের সীমাবদ্ধতা ও রক্ষনশীল বইনটির ছত্রেছত্রে প্রকটিত হয়েছে।
এ আইন দ্বারা ভারত সংসদীয় বা পার্লামেন্টারি ধাঁচের সংবিধান প্রবর্তনের চেষ্টা করা হলে ও প্রকৃত পার্লামেন্টারি বা জনপ্রতিনিধি সভা গঠনের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি।
১৯০৯ সালের আইন ভারতীয়দের প্রতাশা পূরনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।ভারতীয় জনগন এ সময় ভারতে একটি দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিল। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে ভারতে নিয়মতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পথ সৃষ্টি করা হয়।
১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আযিন আপাতদৃষ্টিতে শাসনকার্যে ভারতীয়দের অংশগ্রহণের পরিধি সম্প্রসারণ করলেও কার্যত :একান্ত ব্রিটিশ ভক্ত নরমপন্থী বা মডারেটরাই এ সুযোগ লাভ করতেন। চরমপন্থি এবং বিপ্লবীদের এ সুযোগ লাভ থেকে সূচতুরভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিলো।
এ আইনের মাধ্যমে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। এ আইনের দ্বারা আইন পরিষদের সংস্কার করা হলেও, আইন পরিষদ সদস্যদের কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি। ফলে,আইন পরিষদের সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে বিরামহীন সমালোচনা মত্ত হয়।
এ আইনে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত সদস্য অপেক্ষা মনোনীত সদস্যের সংখ্যা বেশি থাকায় গভর্নর জেনারেল তাঁদের সাহায্য ইচ্ছামত শাসনের অধিকার পান। মনোনীত সদস্যরা ছিলেন তার হাতের পুতুল মাত্র।
মর্লি-মিন্টো আইনে আইন পরিষদগুলোকে যেমন কোনো বিশেষ কোনো ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয়নি, তেমনি ভোটাধিকার আইনে সাধারন লোকদের ভোটাধিকার হতে বন্চিত করা হয়েছে।
ভারতে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাকে প্রশমিত করার জন্যই সাম্রাজবাদী শাসকগোষ্ঠী এ আইন প্রণয়ন করেছিল। ১৯০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লর্ডসভায় প্রদত্ত মর্লির ভাষণ থেকে একথা সুষ্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয়।
এ আইনে প্রাদেশিক আইন পরিষদে বেসামরিক সদস্যদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা দেয়া হয়। কিন্ত এটি ছিল মূলতঃ একটি প্রহসন।প্রাদেশিক স্তরে বেসরকারি সদস্যরা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনে কেন্দ্রে বড়লাটের হাতে ক্ষমতা বিপুলভাবে কেন্দ্রীভূত করা হয়। প্রাদেশিক সরকারগুলোর নামেমাত্র ক্ষমতা ছিল। প্রাদেশিক আইন পরিষদের গৃহীত আইন গভর্নর স্বাক্ষর করারপরেও বড়লাট ইচ্ছা করলে তা নাকচ করতে পারতেন।
এ আইনের দ্বারা ভারতের জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের ক্ষতিসাধন করা হয়। মর্লি ও মিন্টোর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মডারেটদের ও মুসলিম নেতাদের পক্ষভুক্ত করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা। এ আইনের দ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য আংশিকভাবে সফল করা।
মর্লি-মিন্টো আইনে মুসলমানরা পৃথক নির্বাচনের অধিকার পেলেও সাধারন মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়।একমাত্র ধনী অভিজাত মুসলিমরাই ভোটাধিকার ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার পান।
এ আইনে সরককারি সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেননা। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন প্রশ্ন উন্থাপন বা কোনো প্রস্তাব পেশ করতে পারবেননা।
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের সাংবিধানিক তাৎপর্য বা গুরুত্ব:-
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক অগ্রগতি র ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এ আইনের অনেক ত্রুটি থাকা সত্বেও, এর সাংবিধানিক গুরুত্ব কম ছিল না।১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন কোন বিপ্লবী পরিবর্তন না আনলেও, এটি ভারতকে স্বাশাসনের পথে প্রথম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
এ আইনে নির্বাচনের নীতি প্রথমবারের মত প্রবর্তন করা হয়। আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণ তাদের সীমাবদ্ধতা সত্বেও, সরকার এবং জনমতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের সুযোগ পান।
এ আইনে আইন-পরিষদের সদস্যদের ক্ষমতা ও অধিকার বৃদ্ধি করা হয়।এক দশক ধরে আইন পরিষদের সদস্যদের ক্ষমতা ও অধিকার বৃদ্ধি করা হয়। এক দশক ধরে আইন পরিষদে তাঁদের ভূমিকা ও কার্যকলাপ ইংরেজ শাসকদের একথা পরিষ্কারভাবে স্মরন করিয়ে দেয় যে, যদি তাঁদের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে তাঁরা ভারতীয় প্রশাসনে ও প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
আইনে উল্লেখিত, ভারতীয় সদস্যগণ আইন পরিষদে জনগনের অভাব অভিযোগের কথা তুলে ধরার সুযোগ পান। তাঁরা প্রশ্ন এবং প্রস্তাব উন্থাপনের অধিকার প্রায়ই প্রয়োগ করে ছিলেন। এতে সরকারের আমলাতান্ত্রিক প্রকৃতি কিছু পরিমানে সংশোন করা হয়।
গভর্নর জেনারেলের কার্যনির্বাহী পরিষদে ভারতীয়দের প্রথমবারের মত অন্তর্ভুক্তিকরণ এ আইনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নির্বাহী বা শাসন বিভাগে তাঁদের নিয়োগে কেবলমাত্র প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই তাঁদের অংশ গ্রহনের সুযোগ দেয়া হয়নি। বরং প্রশাসনের গোপম বিষয়াদি সম্পর্কে তাঁরা জানাবার সুযোগ লাভ করেন।
গঠন কাঠামো নয়, বরং প্রতিনিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহের ধীর ও মন্থরগতি পরিবর্তনের ফলে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীন পরিবর্তন।
১৯১৮ সালে সাংবিধানিক সংস্কার কমিটি মর্লি- মিন্টো সংস্কার আইনের প্রশংসা করে বলেন যে,” হিন্দু যুগ ও মোগল যুগ থেকে উত্তারাধিকার সূত্রে পাওয়া স্বৈরতন্ত্র শাসকদের সাথে ব্রিটিশরাজের প্রবর্তিত সংবিধানবাদ ও আইনের শাসনের মিলন ঘটান ছিল মর্লি-মিন্টো ১৯০৯ সালের আইনের সর্বাপেক্ষা বড় ভূমিকা।
ভারতে সংসদীয় বা পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থা করা এ আইনের লক্ষ ছিলনা বটে, কিন্তু এর কার্যকারিতার ফলে পরবর্তী পর্যায়ে দেশে দায়িত্বশীল শাসনের প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই উদ্ভূত হয়। এ আইন প্রবর্তনের এক দশক পরেই অথ্যাৎ, ১৯১৮ সালের ভারত শাসন আইন সীমাবদ্ধ আবার হলেও, প্রাদেশিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯০৯ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন বা মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি মৃঢ় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এ আইনেই ভারতের ইতিহাসেসে উল্লেখযোগ্য প্রথম সাংবিধানিক সংস্কার আইন হিসেবে সকল পক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিকট এটি ছিল আলোর দিশারী তবে এ আইন পূর্ববর্তী আইনসমূহ থেকে উন্নতর হলো।১৯০৯ সালের ভারত শাসন আইনভারতবাসীর আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। তবে এর মাধ্যমে ভারতবাসীর জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরো জোরদার হতে থাকে। ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন ছিল ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভের পথে একটি প্রধান দিক চিন্হ। তিনি আরও বলেন, “ এ আইন দ্বারা প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত।না হলেও এ আইনের মর্মকথা ছিল ভবিষ্যতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার নিশ্চিত সোপান রচনা করা।
রুমানা আক্তার
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
পাদটীকা :
১. বঙ্গ,বাঙ্গালা,বাংলাদেশ ( গবেষণা ধর্মী রাজনৈতিক ইতিহাস)
লেখক: প্রফেসর মো: মোজাম্মেল হক।
২. বাংলাদেশের ইতিহাস ( প্রাচীন যুগ থেকে ১৯৭১ খ্রিঃ)
লেখক: মাহবুবুর রহমান
৩. বাংলাদেশের ইতিহাস
লেখক: ডঃ মুহম্মদ আবদুর রহিম;
ডঃ আবদুল মমিন চৌধুরি;
ডঃ এ.বি এম. মাহমুদ;
ডঃ সিরাজুল ইসলাম।


No comments