Irredentism: সংঘাতের লুকোনো এক কারণ
Irredentism
শব্দটি ইতালিয়ান Irredenta শব্দ থেকে উদ্ভূত।
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে, ইতালিতে ঘটমান কিছু রাজনৈতিক আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে
Irredentism শব্দটি প্রথম ব্যবহারিত হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো ইতালিয়ান ভাষাভাষী
সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান অঞ্চলকে নয়া ইতালীয় রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করা।
Irredentism শব্দটির উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Irredentism শব্দটির সংজ্ঞায়নে বলা হয়েছে “Irredentism is a political policy, advocating the restoration to one’s country of any territory formerly belonging to it” অর্থাৎ, Irredentism বস্তুত একটা রাজনৈতিক নীতি, যা একটি রাষ্ট্রের কোন বিচ্ছিন্ন অংশকে পুনরায় সংযুক্তির কথা বলে।
আধুনিক সময়ে জাতি, নৃগোষ্ঠী, ভাষা বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে
রেখে, যখন অন্য দেশের কোন নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডকে
কোন রাষ্ট্র নিজের বলে দাবী করে, তার যৌক্তিকতা বুঝাতে Irredentism শব্দটির ব্যবহৃত
হয়।
যদি
উদাহরণ দিয়ে বলি, ১৯৯০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নিলেন।
তার যুক্তি ছিলো কুয়েত ঐতিহাসিকভাবে ইরাকের অংশ। ঐতিহাসিকভাবে কুয়েতকে ইরাক রাষ্ট্রের
অংশ বলার এই যে নীতি/ আদর্শ/ কল্পনায় বশীভূত
হয়ে সাদ্দাম হোসেন ইরাক দখল করেছিলেন তাকে Irredentism বলে।
Irredentism-
জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের মাঝামাঝি অবস্থান করে। Irredentism এমন ভাবে আন্দোলনকে উস্কে
দিতে পারে যার চরম পরিণতি হল সংঘাত, এমনকি যুদ্ধ। আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক।
লিবিয়া ও তার প্বার্শবর্তী কিছু অঞ্চল প্রাচীন বাইজান্টাইন-রোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। মুসলিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন তিনি ইতালিতে ফ্যাসিবাদের (উগ্র-জাতীয়তাবাদ) উত্থান ঘটান। ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী ইতালিবাসীদের সামনে তিনি নতুন আদর্শ নিয়ে আসেন। তিনি বলেন ইতালির পুরনো শক্তি ফিরিয়ে আনতে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলগুলোকে আবারও ইতালির সাথে যুক্ত করতে হবে। সেই চেতনাকে পুজি করে ইতালি লিবিয়া দখল করেছিল।
ওমর আল মুখতারের নেতৃত্বে লিবিয়াবাসী ইতালির সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। ডেজার্ট অব লায়ন মুভিটাতে ইতালির লিবিয়া অধিগ্রহণের করুন ইতিহাস ফুটে উঠেছে।
Irredentism`র
আরও কিছু উদাহরণ দিলেই প্রতীয়মান হবে যে কিভাবে ধারণাটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ক্রমান্বয়ে
প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। যথাঃ
1.
সুদাতনল্যান্ডকে
জার্মানির ভূখন্ডে অন্তর্ভুক্তির দাবী (এ দাবীই পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে উস্কে দিয়েছিল);
2.
গ্রেটার
গ্রীসের মেগালি আইডিয়া রূপরেখা;
3.
ঐতিহাসিক
দুর্বলতার দিনগুলোতে চীন যে ভূ-খন্ড হারিয়েছিল তা পুনরুদ্ধার;
4.
ত্রিয়ানন
চুক্তিকে ঘিরে স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির মধ্যে সংঘাত;
5.
নগার্নো-কারাবাখ
ভূখন্ড নিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সংঘাত;
6.
ফকল্যান্ড
দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সংঘাত;
7.
কসোভোতে
সার্বিয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি।
কিছুক্ষেত্রে
এমন উদাহরণও পাওয়া যায় যেখানে রাষ্ট্র তার সংবিধানের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে
(Irredentism কে) বৈধতা দেয়। যেমনঃ আর্জেন্টিনা নিজের সংবিধানে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের
অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে আর্জেন্টাইনবাসীর আবশ্যিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে। চীন
তার সংবিধানে তাইওয়ানকে পবিত্র ভূমি হিসেবে উল্লেখ করে চীনের মূল ভূখন্ডের অংশ বলে
দাবী করে।
শান্তি
ও সংঘর্ষ বিশ্লেষকরা Irredentism কে যুদ্ধ বা সংঘাতের এক মৌলিক (লুকোনো) নিয়ামক হিসেবে
বিবেচনা করেন। তারা Irredentism কে পাঁচটি ধাপে ব্যাক্ষার চেষ্টা করেন। যথাঃ
1.
কাঠামোগত
(Structural)
2.
বাস্তবিক
(Realist)
3.
যৌক্তিকতা
(Rational)
4.
আভ্যন্তরীণ
(Domestic)
5.
গঠনমূলক
(Constructive)
Irredentism এর কাঠামোগত ব্যাক্ষা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) বনাম জাতীয় আত্ম-নির্ধারণ (Self-Determination) নীতিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। রাষ্ট্র তার আত্ম-নির্ধারণী (Self-Determination) অধিকার বলে অন্যদেশে নিজের ভূখন্ড চিহ্নিত করে এবং জাতীয়তাবাদকে (Nationalism) কাজে লাগিয়ে সে ভূখন্ড হাসিলের প্রচেষ্টা চালায়।
যেমনঃ আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান রাষ্ট্র দুটি উভয়ের আত্ম-নির্ধারণী (Self-Determination) শক্তিকে পুঁজি করে নাগার্নো-কারাবাখ ছিটমহলকে অধিকারে প্রায়শই সংঘাত, এমনকি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এক্ষেত্রে আত্ম-নির্ধারণী (Self-Determination) নীতি/প্রিন্সিপাল উভয়কেই এই ছিটমহল অধিকারে সংঘাত বা যুদ্ধে অবতীর্ন হওয়ার বৈধতা দিয়ে থাকে।
তবে সার্বভৌমত্ব মূলনীতিটি এ ধরণের বৈধতার বিরোধীতা করে, এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন
ভূখন্ডকেই একমাত্র অধিকারভুক্ত বলে উল্লেখ করেন।
Irredentism এর রিয়ালিস্ট/ বাস্তববাদী ব্যাক্ষা রাষ্ট্রের শক্তি ভারসাম্যের (Balance of Power) গুরুত্বের দিকটা তুলে ধরে। সামরিক শক্তিমত্তাই একটি রাষ্ট্রকে Irredentism চেতনায় উস্কে দিতে পারে।
যেমনঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান পার্ল হারবার আক্রমন করেছিলো হাওয়াইকে নিজের বলে দাবী করে; জার্মান- ফ্রান্স ও বৃটেনকে সংঘাতের ভয় দেখিয়ে সুদাতেনল্যান্ডকে জার্মানভুক্ত করেছিল; এবং ব্রিটিশ সামরিক শক্তির কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপ বৃটেনের ভূখন্ডে পরিণত হয়েছিলো।
ফলে শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকার অর্থ রাষ্ট্রগুলোর
মাঝে ভূখন্ড দখলের প্রচেষ্টার ইতি ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
Irredentism
এর যৌক্তিক বা রেশনাল ব্যাক্ষা সবসময় নেতৃস্থানীয় সিদ্বান্তের সাথে সম্পর্কিত। সিদ্বান্ত
গ্রহণের রূপ সেক্ষেত্রে দুটি। যথাঃ উচ্চবিত্তের সংঘাত (Elite Conflict) ও বিকল্পপথ
(Diversion) সৃষ্টি।
উদাহরন দিয়ে যদি বলি, সার্বিয়ান নেতা স্লোভোদান মিলোসেভিক সার্বিয়াকে বলকান অঞ্চলের ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যেতে কসোভো, ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়া-হার্জেগভিনার উচ্চবিত্ত নেতাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন, অর্থাৎ, স্লোভোদান এই তিনটি অংশে সার্বিয়ান ভাষাভাষী অঞ্চলকে সার্বিয়ার অংশ করার আন্দোলন শুরু করেন।
Irredentism কে যেভাবে বিকল্প পথ সৃষ্টিতে ব্যবহার করা
যায় তার ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে ১৯৮০র দশকের আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসন। আর্জেন্টাইনবাসী
যখন স্বৈরশাসক লোপাল্ডো কাস্তেলিকে ক্ষমতাচ্যুতের আন্দোলনে ব্যস্ত, ঠিক তখন বৃটেন ফকল্যান্ড
দ্বীপ দখল করে নেয়। কাস্তেলি এই সুযোগে সরকার বিরোধী আন্দোলনের মুখকে ফকল্যান্ড দ্বীপ
রক্ষার আন্দোলনে রূপ দেয়, এবং জনগণ সর্বাত্মকভাবে ফকল্যান্ড যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রূপকে Irredentism জনসংখ্যার (Demography) এবং সরকার ব্যবস্থার (Government System) নিরিখে দেখিয়ে থাকে। Demographic দৃষ্টিতে সমান শ্রেণিভুক্ত নৃগোষ্ঠীর ভিতরে পুনর্মিলনী মনোভাব তৈরি হতে পারে। যেমনঃ আফ্রিকার জ্যামিতিক সীমারেখা, অনেক নৃগোষ্ঠীর মধ্যে একটা বিচ্ছেদ হিসেবে কাজ করে।
বর্তমানে আফ্রিকার প্রধান কিছু মৌলিক সঙ্কটের মধ্যে সজাতীয় নৃগোষ্ঠীর পুনরায় যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও সে আকাঙ্ক্ষা পূরণে বিভিন্ন সংঘাতে লিপ্ত হওয়া অন্যতম। রুয়ান্ডায় জেনোসাইড এই সংঘাতের এক ক্লাসিক ও হৃদয় বিদারক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে, সরকার ব্যবস্থা
যখন গণতান্ত্রিক থাকে তখন Irredentism তেমন কাজ করে না, কেননা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়
নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের বড় ছোট সকল নৃগোষ্ঠীর মাঝে সমন্বয় ও সৌহার্দে বজায় রাখার
চেষ্টা করে। কিন্তু উপরে আর্জেন্টিনার স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থা কিভাবে
Irredentism কে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
সর্বশেষে Irredentism সামাজিক বিভিন্ন চেতনা ও আইডিয়ার গঠনমূলক ব্যাক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে। গঠনমূলক ব্যাক্ষাও দুইভাবে দেয়া হয়। যথাঃ
(১) একটা রাষ্ট্র নিজের আইডেন্টিটি যেভাবে নির্ধারণ করে সেখানে অনেকাংশে Irredentism প্রবণতাটি লক্ষণীয়। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা নিজেদের বিশুদ্ধ আর্য হিসেবে পরিচয় দিতে থাকে, এবং সেজন্য অস্ট্রিয়ার জার্মানভাষীদের জার্মানভুক্ত করতে অস্ট্রিয়া দখল করে।
(২) পুনর্মিলনী চেতনাকে অনেক সময় সমাজ বৈধতা দিয়ে থাকে। এই বৈধতার কেন্দ্রে থাকে রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে ও রাষ্ট্রের লক্ষ্যে পোঁছতে প্রয়োজনে অন্যের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া।
যেমনঃ ইসরায়েলি সমাজে
সমগ্র ফিলিস্তিন দখলের চেতনাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠে। গ্রেটার ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে ফিলিস্তিনিদের
উপর নিদারূন অত্যাচার ইস্রায়েল করে যাচ্ছে, এবং সেক্ষেত্রে ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী ইসরাইলি
সমাজ থেকে সমর্থন পায়।
অতএব, Irredentism ধারণাটি একটু জটিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এই ধারণাটি বেশ গুরুত্ব বহন করে। জাত, ভাষা, কৃষ্টি, নৃগোষ্ঠী প্রভৃতির ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র যখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ কোন ভূখন্ডের উপর দাবী করে তাই Irredentism, আর যে রাষ্ট্র/ব্যক্তি/সমাজ দাবীটি করে তাকে Irredentist বলে।
তাই, আন্তর্জাতিক বিবিধ সংঘাত বিশ্লেষণে
Irredentism ধারণাটি আমাদের সহায়ক হতে পারে।
ভাবানুবাদকঃ
বদিরুজ্জামান
স্নাতক
ও স্নাতকোত্তর
আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিভাগ, জাবি
মূল
লেখকঃ
Thomas
Ambrosio
North
Dakota State University
Fargo,
North Dakota, United States


No comments