ম্যাকেইন্ডারের হার্টল্যান্ড থিউরি (Heart Land Theory) কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক?
> কেনো সোভিয়েত ইউনিয়ন স্ট্যালিনের সময় থেকে বিভিন্ন দেশকে তাদের ইউনিয়নভুক্ত করতে শুরু করে? কেনই বা আফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এত জরুরী হয়ে উঠেছিলো? > কেন ১৯৯০'র দশকে জর্জ বুশ ইউরেশিয়া অঞ্চলকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেয়? কেন এক বিংশ শতকে এশিয়া পিভোট অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে কৌশলগত জায়গা হিসেবে স্বীকার করছে? > কেন রাশিয়া বাল্টিক ও বলকান অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোতে তার প্রভাব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে? ইত্যাদি।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গভীরভাবে অনুধাবনে আমাদের ইতিহাসের উক্ত প্রেক্ষাপটগুলোর ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাসকে অবশ্যয়ই প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ কৌশলবিদ হেলফোর্ড মেকেন্ডারের 'হার্টল্যান্ড তত্ত্ব' টি উপরিউক্ত প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণে খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
হার্টল্যান্ড থিউরিঃ ১৯০৪ সালে হ্যালফোর্ড ম্যাকেইন্ডার তার বিখ্যাত গ্রন্থ "The Geographical Pivot of History " র মাধ্যমে স্যার রুডলফ কেজেলেফের ভূ-রাজনৈতিক কনসেপটটিকে নতুন রূপে প্রকাশ করেন [১]। বইটিতে স্যার ম্যাকেইন্ডার "হার্ট ল্যান্ড থিউরি" কে বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতি অনুধাবনে আবশ্যক এক ধারণা হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমান রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচটি দেশ ( কাজাখাস্তান, কিরগিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও উজবেকিস্তান) ও কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলকে ম্যাকেইন্ডার তার তত্ত্বে "কেন্দ্রীয় ভূমি বা পিভোট (Pivot)/ হার্ট ল্যান্ড" হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেন্ট্রাল এশিয়ার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত কিছু ক্রিটিকাল কাঁচামাল যেমনঃ ইউরোনিয়াম, প্লুটোনিয়াম ইত্যাদির জন্য এই অঞ্চলকে তিনি "The Great Pivot" হিসেবে আখ্যা দেন।
যাহোক, মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে Pivot শব্দটি বলতে কী বুঝায় তা জেনে নেয়া দরকার। Pivot শব্দটির কিছু অর্থঃ ১। যে পিন বা বিন্দুকে কেন্দ্র করে কোনো কিছু ঘোরে; আবর্তনকীলক; ২। যার উপর যুক্তি বা আলোচনা নির্ভর করে; কেন্দ্রবিন্দু ;৩। যে ব্যক্তি বা একককে কেন্দ্র করে একটি সেনাদল ডানেবাঁয়ে দিক পরিবর্তন করে ইত্যাদি [২]
অতএব, ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে, যে নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বিশ্ব-রাজনীতি আবর্তিত হতে থাকে তাই Pivot অঞ্চল বা হার্টল্যান্ড।
আজকের লেখায় যে পয়েন্টগুলো থাকছেঃ১. হার্টল্যান্ড থিউরির প্রেক্ষাপট ও সেন্ট্রাল এশিয়া।২. রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে এই থিউরির প্রভাব এবং৩. বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে হার্টল্যান্ড তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা।
হার্টল্যান্ড থিউরির প্রেক্ষাপট ও সেন্ট্রাল এশিয়া।
ম্যাকেইন্ডারের ভাষায়, ভৌগলিক অবস্থান রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। সেক্ষেত্রে হার্টল্যান্ড বা পিভোট অঞ্চল বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। ম্যাকেইন্ডারের তত্ত্বানুসারে সেই হার্টল্যান্ড হল ইউরেশিয়া। তার ভাষ্যমতে, বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভুত্ব কায়েমে ইউরেশিয়া অঞ্চলের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা আবশ্যক।
হার্টল্যান্ড থিউরি বুঝানোর জন্যে স্যার ম্যাকেইন্ডার খুব সহজ একটি সমীকরণ উপস্থাপন করেছেন। যথাঃ
"১. যে পূর্ব এশিয়া/ ইউরেশিয়াকে শাসন করবে, সে হার্টল্যান্ডের প্রভুত্ব অর্জন করবে;
২. যে হার্টল্যান্ডকে শাসন করবে, সে বিশ্ব-দ্বীপের (World-Island) প্রভুত্ব অর্জন করবে; এবং
৩. যে বিশ্ব-দ্বীপকে (World-Island) শাসন করবে, সে গোটা বিশ্বের প্রভুত্ব অর্জন করবে। "
ম্যাকেইন্ডার প্রদত্ত ভূ-রাজনীতির এমন সহজ সমীকরণ নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। থিউরির দিক থেকে সমালোচনার তেমন কোন জবাব না আসলেও, বিশ্ব-শক্তিগুলোর নিকট সেন্ট্রাল এশিয়ার গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে কেন বেড়ে চলেছে সেদিকটিকে থিউরিতে ভালো করে দেখানো হয়েছে।
বিশ্ব-রাজনীতিতে সেন্ট্রাল এশিয়াঃ স্যার ম্যাকেইন্ডার, তার হার্টল্যান্ড থিউরিতে Pivot অঞ্চল হিসেবে সেন্ট্রাল এশিয়া ও ইউরেশিয়ার দেশগুলোকে ইঙ্গিত করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই অঞ্চলের প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন সৃষ্টি এবং এই সংস্থায় ভারত, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও যুক্তরাষ্ট্রের নাখোশ হওয়া ইত্যাদি বুঝিয়ে দেয় সেন্ট্রাল এশিয়ার গুরুত্ব আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা বেড়েছে [৩] 
সেন্ট্রাল এশিয়া
ভূ-তাত্তিক গবেষণায় বলা হয়েছে যে বিশ্বের যে অঞ্চলগুলোয় সর্বোচ্চ পরিমাণে মূল্যবান খনিজ পদার্থ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে- কাস্পিয়ান সাগর ও এর তীরবর্তী অঞ্চল তার অন্যতম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ অঞ্চলে প্রায় ৫০-১১০ বিলিয়ন ব্যারেল পরিমান তেল এবং প্রায় ১৭০-৪৬৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে [৪]। এজন্যই বৃহৎ শক্তিগুলো সেন্ট্রাল এশিয়ায় তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে সদা তৎপর।
ফলে সেন্ট্রাল এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দুইটি প্রবণতা আগত সময়ে দেখা দিতে পারেঃ ১. এই সম্পদ আহরণে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, এবং২. এই প্রতিযোগিতা যখন অসম আঁকার ধারণ করবে তখন এ অঞ্চলে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে সেন্ট্রাল এশিয়াঃ নাইন এলিভেনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির রাডার সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরে গেলেও, মধ্যপ্রাচ্যের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হিসেবে সম্পদশালী সেন্ট্রাল এশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে তৎকালীন স্টেট সেক্রেটারী কলিন পাওয়েল উল্লেখ করেন [৫] । তবে, বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক বৈদেশিক নীতিকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। যথাঃ - সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাবকে রুখে দেয়া, এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তার রোধে রাষ্ট্রগুলোর সাথে একযোগে কাজ করা;
- ভূ-অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কিভাবে ব্যবহার করা, এবং এ অঞ্চলে রাশিয়ার রাজনৈতিক আধিপত্য কমানো;
- রাষ্ট্রগুলোর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করা।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সিনিয়র ফেলো স্টিফেন ব্লাংকের মতে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে তিনটি কাজ করছে [৬]। যথাঃ ১. প্রাপ্ত জ্বালানি শক্তির যোগান নিশ্চিত করা; ২. জ্বালানি শক্তি যোগানের ক্ষেত্রে যেন একচেটিয়া আধিপত্য বৃদ্ধি না পায় সেক্ষেত্রে নজর দেয়া; এবং৩. সেন্ট্রাল এশিয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিস্তার করা। তবে এই পথে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইরান জোট। যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সামরিক সম্পর্কে যেতে হচ্ছে। সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক রাশিয়ান নীতিঃ বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে রাশিয়া তার 'উঠোন' ( Backyard/ Near-abroad) হিসেবে ঘোষণা করে ।
প্রফেসর পিটার রুটল্যান্ডের ভাষায়, রাশিয়া তার উঠোনকে নিয়ে দুটি নীতিতে বিশ্বাসীঃ ১. সেন্ট্রাল ও কাস্পিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা, এবং ২. অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করা।
তবে রাশিয়ান এলিটদের বড় প্রভাব রয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনীতিতে। এই অঞ্চল ঘিরে রাশিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক, এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। রাশিয়ান এলিটদের মতে, পশ্চিমাদের সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রীক নীতির কেন্দ্রে রয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে নস্যাৎ করা। সে কারণে এই অঞ্চলে চীনকে রাশিয়া তার কৌশলগত মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার বড় উদাহরণ হল সাংহাই কো-আপারেশন অর্গানাইজেশন [৭]
কিন্তু এই অঞ্চলের দেশগুলোর ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধের মতন রাশিয়া ভক্তি খুব একটা বেঁচে নেই। কৌশলগত দিক বিবেচনায় তাই রাশিয়ার উৎকণ্ঠার জায়গা হল এই শূন্যস্থান পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ। সেদিক বিবেচনায়, রাশিয়াকে তার এই উঠোনকে সর্বাধিক গুরত্ব দিয়ে থাকে, বিশেষত সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলের দেশগুলো কিভাবে গ্রহণ করবে তা আসন্ন সময়েই বলে দিবে। চীনের বৈদেশিক নীতিতে সেন্ট্রাল এশিয়াঃ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিয়ে চীনের ভাবনা বেশ ভিন্ন [৯]। যথাঃ
প্রথমতঃ সেন্ট্রাল এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাথে চীনের সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। ফলে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনা সীমান্ত নিরাপত্তা চীনের অন্যতম গুরুত্বের জায়গা;
দ্বিতীয়তঃ চীনের জিনজিয়ান প্রদেশের উইঘুর সম্প্রদায়কে নিয়ে চীন খুব উদ্বিগ্ন। উইঘুরদের চীন নিজস্ব সাংস্কৃতি, ভাষা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি ও সেখানে উইঘুরদের উপর কড়া প্রেষণ আন্তর্জাতিক মহল থেকে দারুনভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এই উইঘুরদের আদি বাসস্থান ছিলো সেন্টাল এশিয়ার বেশ কিছু দেশে যেমনঃ কাজাখাস্তান, কিরগিস্তান ও তাজিকিস্তান। ফলে সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিয়ে একটা নিরাপত্তা ঝুঁকি চীনা নীতিতে লক্ষ্যণীয়।
তৃতীয়তঃ সেন্ট্রাল এশিয়ার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানির সহজলভ্যতা বর্ধীয়মান চীনা উৎপাদন ব্যবস্থার টেঁকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। ফলে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন তৈরির মাধ্যমে চীন সেন্ট্রাল এশিয়ার তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায়ে নিজেকে রাশিয়ার কৌশলগত মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে।
চতুর্থঃ সেন্ট্রাল এশিয়াকে চীনের "বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ/ সিল্ক রোডের" এর একটি কেন্দ্রবিন্দু বলা চলে। চীন সেন্ট্রাল এশিয়াকে একটি হাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে যেখানে তুর্কি, আজারবাইজান, ইরান ও পাকিস্তানের মত দেশগুলো সেন্ট্রাল এশিয়াকে ব্যবহার করে এই প্রকল্পের সাথে জড়িত হতে চাইছে।
পঞ্চমঃ বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে যেভাবে চীন সাহায্য করছে, তার প্রতিদানে একদিকে রাশিয়া চীনের প্রতি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনের অবস্থান রাশিয়ার চেয়ে বেশী সুদৃঢ় হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোও চীনের এই বৃহৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টা করবে। ফলে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনের অনুপ্রবেশ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার থেকেও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হার্টল্যান্ড থিউরির প্রাসঙ্গিকতাঃ যদিও বিশ্ব ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবুও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ম্যাকেইন্ডারের হার্টল্যান্ড তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। ম্যাকেইন্ডার যে পিভোট অঞ্চলকে চিহ্নিত করেছেন, সে অঞ্চল হয়তো পরিবর্তন হতে পারে, যেমনঃ এক বিংশ শতকে রাশিয়ার বাল্টিক অঞ্চলকে বেশি প্রাধান্য দেয়া, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত রক্ষায় ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহার।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে তার বৃহৎ কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রীক ইরান, তুর্কি, চীন ও রাশিয়ার যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা আগত সময়ে ইউরোশিয়া ও সেন্ট্রাল এশিয়াকে আবারও বিশ্ব-রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষত, যে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাব্যতা এই অঞ্চলে রয়েছে, তা বিশ্ব-শক্তিগুলোকে অবশয়্যই প্রলুব্ধ করবে। সেক্ষেত্রে হার্টল্যান্ড থিউরি, ভৌগলিক অবস্থান যেভাবে রাজনৈতিক ধারায় প্রভাব ফেলে তা বিশ্লেষণ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তখন উপরুল্লেখিত প্রশ্নগুলোর উত্তরের একটা ভিত তৈরি হবে।
বদিরুজ্জামানআন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সাভার, ঢাকা। মেইলঃ 03bodir@gmail.com
.
রেফারেন্সঃ[১] Scott, M. 2008. Revisiting the Pivot: The Influence of Heartland Theory in Great Power Politics. https://www.creighton.edu/fileadmin/user/CCAS/departments/PoliticalScience/MVJ/docs/The_Pivot_-_Alcenat_and_Scott.pdf[২] https://www.dictionarybd.com/meaning/pivot[৩] Kazemi, L. 2003. “Domestic Sources of Uzbekistan’s Foreign Policy, 1991 to the Present.” Journal of International Affairs 56: 205 – 216.[৪] Ibid. [৫] Lutz C. Kleveman (2003). The New Great Game: Blood and Oil in Central Asia. Atlantic Monthly Press. New York. 3.[৬] Bacevich J. Andrew. “Bases of Debate: America in Central Asia: Steppes to Empire.” National Interest Online (2002). http://www.nationalinterest.org/General.aspx?[৭] Blank J. Stephen. 2001. United States and Central Asia in Central Asian Security: The New International Context. Brooking Institute Press. https://www.fpri.org/contributor/stephen-blank/ [৮] Jonson, L. 2001. "Russian and Central Asia" in Central Asian Security: The New International Context. Brooking Institute Press.[৯] Dwivdedi, R. 2006. China's Central Asia Policy in Recent Times. The China and Eurasia Forum Quarterly.
![]() |
| সেন্ট্রাল এশিয়া |
- সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাবকে রুখে দেয়া, এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তার রোধে রাষ্ট্রগুলোর সাথে একযোগে কাজ করা;
- ভূ-অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কিভাবে ব্যবহার করা, এবং এ অঞ্চলে রাশিয়ার রাজনৈতিক আধিপত্য কমানো;
- রাষ্ট্রগুলোর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করা।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সিনিয়র ফেলো স্টিফেন ব্লাংকের মতে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে তিনটি কাজ করছে [৬]। যথাঃ
১. প্রাপ্ত জ্বালানি শক্তির যোগান নিশ্চিত করা;
২. জ্বালানি শক্তি যোগানের ক্ষেত্রে যেন একচেটিয়া আধিপত্য বৃদ্ধি না পায় সেক্ষেত্রে নজর দেয়া; এবং
৩. সেন্ট্রাল এশিয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিস্তার করা।
তবে এই পথে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইরান জোট। যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সামরিক সম্পর্কে যেতে হচ্ছে।
সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক রাশিয়ান নীতিঃ
বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে রাশিয়া তার 'উঠোন' ( Backyard/ Near-abroad) হিসেবে ঘোষণা করে ।
প্রফেসর পিটার রুটল্যান্ডের ভাষায়, রাশিয়া তার উঠোনকে নিয়ে দুটি নীতিতে বিশ্বাসীঃ
১. সেন্ট্রাল ও কাস্পিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা, এবং
২. অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করা।
তবে রাশিয়ান এলিটদের বড় প্রভাব রয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনীতিতে। এই অঞ্চল ঘিরে রাশিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক, এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। রাশিয়ান এলিটদের মতে, পশ্চিমাদের সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রীক নীতির কেন্দ্রে রয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে নস্যাৎ করা। সে কারণে এই অঞ্চলে চীনকে রাশিয়া তার কৌশলগত মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার বড় উদাহরণ হল সাংহাই কো-আপারেশন অর্গানাইজেশন [৭]
কিন্তু এই অঞ্চলের দেশগুলোর ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধের মতন রাশিয়া ভক্তি খুব একটা বেঁচে নেই। কৌশলগত দিক বিবেচনায় তাই রাশিয়ার উৎকণ্ঠার জায়গা হল এই শূন্যস্থান পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ। সেদিক বিবেচনায়, রাশিয়াকে তার এই উঠোনকে সর্বাধিক গুরত্ব দিয়ে থাকে, বিশেষত সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলের দেশগুলো কিভাবে গ্রহণ করবে তা আসন্ন সময়েই বলে দিবে।
চীনের বৈদেশিক নীতিতে সেন্ট্রাল এশিয়াঃ
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিয়ে চীনের ভাবনা বেশ ভিন্ন [৯]। যথাঃ
প্রথমতঃ সেন্ট্রাল এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাথে চীনের সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। ফলে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনা সীমান্ত নিরাপত্তা চীনের অন্যতম গুরুত্বের জায়গা;
দ্বিতীয়তঃ চীনের জিনজিয়ান প্রদেশের উইঘুর সম্প্রদায়কে নিয়ে চীন খুব উদ্বিগ্ন। উইঘুরদের চীন নিজস্ব সাংস্কৃতি, ভাষা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি ও সেখানে উইঘুরদের উপর কড়া প্রেষণ আন্তর্জাতিক মহল থেকে দারুনভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এই উইঘুরদের আদি বাসস্থান ছিলো সেন্টাল এশিয়ার বেশ কিছু দেশে যেমনঃ কাজাখাস্তান, কিরগিস্তান ও তাজিকিস্তান। ফলে সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিয়ে একটা নিরাপত্তা ঝুঁকি চীনা নীতিতে লক্ষ্যণীয়।
তৃতীয়তঃ সেন্ট্রাল এশিয়ার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানির সহজলভ্যতা বর্ধীয়মান চীনা উৎপাদন ব্যবস্থার টেঁকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। ফলে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন তৈরির মাধ্যমে চীন সেন্ট্রাল এশিয়ার তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায়ে নিজেকে রাশিয়ার কৌশলগত মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে।
চতুর্থঃ সেন্ট্রাল এশিয়াকে চীনের "বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ/ সিল্ক রোডের" এর একটি কেন্দ্রবিন্দু বলা চলে। চীন সেন্ট্রাল এশিয়াকে একটি হাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে যেখানে তুর্কি, আজারবাইজান, ইরান ও পাকিস্তানের মত দেশগুলো সেন্ট্রাল এশিয়াকে ব্যবহার করে এই প্রকল্পের সাথে জড়িত হতে চাইছে।
পঞ্চমঃ বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে যেভাবে চীন সাহায্য করছে, তার প্রতিদানে একদিকে রাশিয়া চীনের প্রতি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনের অবস্থান রাশিয়ার চেয়ে বেশী সুদৃঢ় হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোও চীনের এই বৃহৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টা করবে। ফলে, সেন্ট্রাল এশিয়ায় চীনের অনুপ্রবেশ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার থেকেও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হার্টল্যান্ড থিউরির প্রাসঙ্গিকতাঃ
যদিও বিশ্ব ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবুও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ম্যাকেইন্ডারের হার্টল্যান্ড তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। ম্যাকেইন্ডার যে পিভোট অঞ্চলকে চিহ্নিত করেছেন, সে অঞ্চল হয়তো পরিবর্তন হতে পারে, যেমনঃ এক বিংশ শতকে রাশিয়ার বাল্টিক অঞ্চলকে বেশি প্রাধান্য দেয়া, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত রক্ষায় ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহার।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে তার বৃহৎ কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রীক ইরান, তুর্কি, চীন ও রাশিয়ার যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা আগত সময়ে ইউরোশিয়া ও সেন্ট্রাল এশিয়াকে আবারও বিশ্ব-রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষত, যে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাব্যতা এই অঞ্চলে রয়েছে, তা বিশ্ব-শক্তিগুলোকে অবশয়্যই প্রলুব্ধ করবে। সেক্ষেত্রে হার্টল্যান্ড থিউরি, ভৌগলিক অবস্থান যেভাবে রাজনৈতিক ধারায় প্রভাব ফেলে তা বিশ্লেষণ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তখন উপরুল্লেখিত প্রশ্নগুলোর উত্তরের একটা ভিত তৈরি হবে।
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সাভার, ঢাকা।
মেইলঃ 03bodir@gmail.com
[৫] Lutz C. Kleveman (2003). The New Great Game: Blood and Oil in Central Asia. Atlantic Monthly Press. New York. 3.



No comments