Deterrence বা বাংলায় নিবৃত্তকরণ বা ‘'প্রতিরোধ” আন্তজার্তিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা অধ্যয়ন (Security Studies) এবং কৌশলবিদ্যা অধ্যয়ন (Strategic Studies) এর একটি স্বতন্ত্র তত্ত্ব। Deterrence বা প্রতিরোধ তত্ত্বের ঐতিহাসিক ভিত্তি বা উৎপত্তি বেশ পুরনো। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য থেকেই বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহে রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দুর্গ (Fortification) ও কেল্লা (Castle) নির্মাণ ছিলো প্রাথমিক নিবৃত্তকরণের অংশ।
যদিও, ১৯৪৫ সাল থেকে ‘প্রতিরোধ তত্ত্ব’ স্বতন্ত্র একাডেমিক তত্ত্ব হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এর আগে, একাডেমিয়ায় Deterrence তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়— ১৯২০ সালের শুরুর দিকে, তৎকালীন সময়ে কেমিক্যাল বোম্ব, এক্সপ্লোসিভ, এবং যুদ্ধবিমানের আধুনিকায়নের ফলে। কিন্তু, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত, পুরো সময়কালকেই অধিকাংশ গবেষক, ও একাডেমিশিয়ানরা Deterrence তত্ত্বের ঐতিহাসিক যাত্রা থেকে খারিজ করেছেন। তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে Deterrence তত্ত্বের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৫ সালে।
Deterrence তত্ত্বের সঙ্গায়ন (Definition) নিয়েও রয়েছে বহু মতবিরোধ। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য কিছু সঙ্গা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কারো কারো মতে, শত্রুপক্ষকে হুমকি, শক্তিশালী জবাব, পালটা আক্রমণ, ও প্রতিক্রিয়া ঘোষণা করে কোনপ্রকার আক্রমণ থেকে বিরত বা নিবৃত্ত রাখাই হলো নিবৃত্তকরণ বা প্রতিরোধ।
শত্রুপক্ষ যদি হুমকি, পালটা আক্রমণ, এবং ভয়াবহ ক্ষতির আশংকা থেকে প্রথমে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে তবেই Deterrence বা নিবৃত্তকরণকে সফল বলা যায়। এই ধারার নিবৃত্তকরণকে বলা হয় ‘Deterrence by Denial’ অর্থাৎ, শত্রুপক্ষকে এমনভাবে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ও ভয় দেখানো যাতে শত্রুপক্ষ কখনই প্রথমে আক্রমণ করার সাহস না পায়। অধ্যাপক থমাস শেলিং, Deterrence by Denial কে সঙ্গায়িত করেছেন এভাবে, ‘'শত্রুপক্ষের অযাচিত আক্রমণ (Unwanted Actions) ও যুদ্ধ থেকে নিবারণে রাখাই (War Prevention) হলো Deterrence।
কিন্তু এই সঙ্গা ‘প্রতিশোধ’ বা পালটা আক্রমণ (Retaliation) কে অস্বীকার করে না। কারণ, শত্রুপক্ষ যদি কোন কারণে, প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা, প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কে বিশ্বাসযোগ্য না ভাবে, এবং হুমকিকে নিছকই মিথ্যে আশংকা ভেবে আক্রমণ করে বসে তাহলে নিবৃত্তকরণ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। সুতরাং, নিবৃত্তকরণ তখনই সফল হবে, যখন শত্রুপক্ষ হুমকি, ভয়াবহ ক্ষতি, এবং পাল্টা-হামলার আশংকায় প্রথম আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে।
প্রখ্যাত সমরবিদ ও আন্তজার্তিক সম্পর্কের অধ্যাপক ব্যারি বুজান বলেন, Deterrence by Denial (DbD) সামরিক তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারই (Defence) এর সমার্থক, দুটোর প্রধান কাজই হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমন শক্তভাবে নিশ্চিত করা, যাতে শত্রুপক্ষের কাছে আক্রমণ করা বা হামলা চালানো অর্থহীন, অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দূরহ কিংবা অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। ডিনায়াল পদ্ধতিতে নিবৃত্তকরণ কোনপ্রকার যুদ্ধ, সামরিক সংঘর্ষ বা অযাচিত আক্রমণ প্রথম পর্যায়ে শুরু হওয়া থেকেই রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখে। অধ্যাপক থমাস শেলিং এই সঙ্গানুসারে- নিবৃত্তকরণের বিপরীত কনসেপ্ট হিসেবে ধরেছেন ‘Compellence’ বা বশ্যতা/বাধ্যতা কে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা গবেষক ও অধ্যাপকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্বে Deterrence এর ধারণা ছিলো সম্পূর্ণ Realitatory বা প্রতিশোধমূলক। ইউরোপের নেপোলিয়নিক যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ, এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রাম, এই Deterrence by Retaliation (DbR) এর উন্নতি তরান্বিত করেছে। প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ মূলত শত্রুপক্ষের আক্রমণের পালটা জবাবে- ভয়াবহ হামলা, নিশ্চিত আক্রমণ, সমান ক্ষতি নিশ্চিতকরণ, এবং জরুরী প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে নিবৃত্তকরণ করে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণের বিকাশের আরেকটি কারণ হলো ট্র্যাডিশনাল ‘শক্তির ভারসাম্য নীতি’র (Balance of Power) বিকাশ ও চর্চা। এর মানে এই না যে, শত্রুপক্ষ যে স্থানে, যে উদ্দেশ্যে এবং যে কনটেক্সটে আক্রমণ করেছে, তা পূঙ্খানুপুঙ্খু ভাবে অনুসরণ করে পালটা হামলা বা আক্রমণ চালানো হবে।
Deterrence by Retaliation (DbR) এর একমাত্র লক্ষ্য হলো, সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া বা ঘায়েল করা। যেমনঃ স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একে অন্যের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার এক ধরনের ঝুঁকি ছিলো Deterrence by Retaliation (DbR) পলিসি। প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ (DbR) ও প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ (DbD) এর মূল পার্থক্য হলো প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণে প্রধান লক্ষ্য থাকে আক্রমণে সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা, এবং শত্রুরাষ্ট্রও পাল্টা-আক্রমণ হিসেবে সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধনের চেষ্টা চালায়; অন্যদিকে প্রত্যাখানমূলক নিবৃত্তকরণের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা এত জোরদার করা যাতে যে কোন ধরনের আক্রমণ শুরুতেই ব্যর্থ হয়। নিচে এ দু’ধরনের নিবৃত্তকরণ পদ্ধতির তুলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা হলোঃ
|
বৈশিষ্ট্য
|
প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ
|
প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ
|
|
অপারেশনের মেকানিজম
|
কোনপ্রকার আক্রমণ বা হামলা চালানোর
পূর্বেই তা অকার্যকর, ব্যর্থ কিংবা অসুবিধাজনক করে তোলা।
|
আক্রমণ বা হামলা চালালে, পাল্টা-আক্রমণে
সমপরিমাণ বা সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা হবে এই হুমকি দ্বারা নিবৃত্তকরণ।
|
|
লক্ষ্য
|
আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রাইমারি টার্গেট
সামরিক স্থাপনা, সেনানিবাস, অস্ত্রাগার, কিংবা নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি।
|
আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রাইমারি টার্গেট
জনসাধারণ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক শহর, বন্দর, রাজধানী, ব্যাংক সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
|
|
বিশ্বাসযোগ্যতা
|
তূলনামূলকভাবে বেশি বিশ্বাসযোগ্য কেননা,
এটি আত্মনির্ভরশীলতা ও নিজস্ব সুরক্ষার প্রতি বেশি নজর দেয় এবং প্রাথমিক আক্রণের
পথ অসুবিধাজনক করে তোলে।
|
বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে
যদি শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে বসে এবং প্রতিপক্ষ তার পালটা জবাব দিতে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে
শুধুমাত্র সংঘর্ষে লিপ্ত রাষ্ট্রদ্বয় (warring parties/states) ই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী
সকল দেশেরও উক্ত দেশের সামরিক সক্ষমতার ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
|
|
উদাহরণ
|
জার শাসিত রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা,
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ও বর্তমানে তাইওয়ানের প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
|
স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালীন নিউক্লিয়ার
ডিটারেন্স (সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম মার্কিন বলয়), ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার
ডিটারেন্স।
|
Deterrence তত্ত্বের বিকাশঃ
Deterrence যুদ্ধ-বিগ্রহে সবসময় কাজ করলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়েছে পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষকদের হাত ধরে। অন্যদিকে, Deterrence শত-শত বছর ধরে সংঘাতে চর্চা হয়ে আসলেও, প্রাচ্যের কেউ-ই Deterrence-কে আলাদা তত্ত্ব হিসেবে দেখাননি। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় ফ্রান্স কর্তৃক রাশিয়ায় আক্রমণ থেকে বলশেভিক বিপ্লব পর্যন্ত সময়ে, প্রাচ্যে— মূলত রাশিয়া ও চীনে নিবৃত্তকরণ বলতে শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সীমান্ত সুরক্ষিতকরণ, ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকেই নজর দেয়া হয়েছে। যা মূলত (DbD) প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণের অংশ। রাশিয়া Deterrence-কে সবসময়ই প্রত্যাখ্যানমূলক হিসেবে দেখেছে, কারণ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সবসময়ই রাশিয়া আক্রমণ ও দখলের একটা সূক্ষ আকাঙ্খা ছিলো, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই রাশিয়া দখলে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, রাশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সবসময়ই একটা বড় অংশ জুড়ে ছিলো সামরিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধি, সীমান্ত সুরক্ষিত করণ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Deterrence তত্ত্ব শুরু থেকেই পরিচিতি পেয়েছিলো প্রতিক্রিয়াশীলতার মাধ্যমে। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ নেয়, প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ (DbR) তত্ত্বের মাধ্যমে। নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের বিকাশকে ৩টি Wave বা ধারায় বিভক্ত করা যায়। তথাঃ ফার্স্ট ওয়েভ, সেকেণ্ড ওয়েভ বা সোনালী সময় (গোল্ডেন এজ) ও থার্ড ওয়েভ।
First Wave:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদম শেষদিকে কিছু ব্রিটিশ ও আমেরিকান নিরাপত্তা গবেষক Deterrence-কে আলাদাভাবে সঙ্গায়িত করে প্রাথমিক কিছু আইডিয়া দিয়ে তাত্ত্বিক যাত্রা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে পশ্চিমা নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের মূল আইডিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গবেষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বার্নাড ব্রডি, জ্যাকব ভিনার, ভ্যানেভার বুশ, উইলিয়াম বর্ডেন, ও বাসিল লিডেল হার্ট। জাপানে পারমাণবিক আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত Deterrence তত্ত্ব শুধু বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছে। ফলে, Deterrence বা নিবৃত্তকরণের প্রাচীন চর্চা ও একটা বড় অংশ যেটা প্রাচ্যে চর্চা হয়ে আসছে, তা সম্পূর্ণভাবে ফার্স্ট ওয়েভে বাদ পড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর, ১৯৪৫ সালে তাত্ত্বিকদের দল আবারো প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণের দিকেই ঝুঁকে পড়েন এই যুক্তিতে যে, জাপান পার্ল হারবারে আক্রমণের ফলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক পারমাণবিক আক্রমণ করেছে, ফলে একে প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ ভাবার সুযোগ নেই। মূলত, পশ্চিমে প্রতিশোধমূলক Deterrence তত্ত্বের উদ্ভাবন ও বিকাশ হয়েছে সর্বোচ্চ, অন্যদিকে প্রাচ্যে প্রত্যাখ্যানমূলক Deterrence চর্চা হয়ে আসছে শত-শত বছর ধরে। পশ্চিমা পণ্ডিতরা প্রত্যাখ্যানমূলক Deterrence-কোনরকম সঙ্গায় সঙ্গায়িত করেননি প্রথম থেকেই, বরং একে ‘প্রতিরক্ষাব্যবস্থা'র (Defense) এর সমার্থক হিসেবে দেখিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে একক আধিপত্য কায়েম করে, ফলে তাত্ত্বিকদের মতে কোনভাবেই একে নিবৃত্তকরণের সঙ্গায় সঙ্গায়িত করা সম্ভব হচ্ছিলো না, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও বাস্তবায়নের সুযোগ ছিলো না। কারণ, পারমাণবিক শক্তিধর মার্কিনীদের সাথে সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধের হুমকি দেয়ার মতো পরিস্থিতি কোন রাষ্ট্রের ছিলো না। ফলে তাত্ত্বিকদের পক্ষেও, এই নিউক্লিয়ার মনোপলি রাষ্ট্রের জন্যে কোনধরনের ডিটারেন্স বা নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের বিকাশ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফার্স্ট ওয়েভ সম্পর্কে অধ্যাপক ব্যারি বুজান বলেন, ফার্স্ট ওয়েভ ছিলো একটা তত্ত্বের উদয়, বিকাশ নয়। মূলত, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর যতক্ষণ না অন্যান্য রাষ্ট্র একই মাপের শক্তি সঞ্চয় করছে, ততদিন কোনভাবেই নিবৃত্তকরণ কাজ করবে না।
Second Wave বা Golden Age
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে একক আধিপত্য শুরু করে, তখন মার্কিনীদের নীতি ছিলো প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ (DbR) কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার মত শক্তি তখনও কেউ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে নিউক্লিয়ার টেস্ট সম্পন্ন করে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হলে, দুনিয়াব্যাপী নিরাপত্তা অধ্যয়ন (Security Studies), প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন (Defense Studies), ও কৌশল বিদ্যা অধ্যয়নে (Strategic Studies) এক আমূল পরিবর্তন আসে। ফার্স্ট ওয়েভের আইডিয়াগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে হয়, কৌশলবিদ্যায় আসে সোনালী সময়। একই সাথে, মার্কিনদের যুদ্ধ প্রতিরোধ করার করার যে একক আধিপত্য ছিলো, তা অনেকটাই খর্ব হয়।
অধ্যাপক ব্যারি বুজান বলেন, সম্পূর্ণ নিবৃত্তকরণ তত্ত্ব ও এর বিকাশকে শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে মাপা সম্ভব, কারণ এমন দীর্ঘমেয়াদী সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অন্য কোন রাষ্ট্রের ছিলো না, এবং অন্য কোন রাষ্ট্রে নিজস্ব প্রভাব খাটানোর (Proxy War) ইচ্ছাও অন্য কোন রাষ্ট্রের ছিলো না। কিন্তু, এতকিছুর পরও, পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ১৯৫৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ প্রতিশোধমূলক নীতি (Massive Retaliation) কার্যকর করেন, ফলে তাত্ত্বিকদের জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে তত্ত্ব ও নীতির মধ্যকার সেতু তৈরি সম্ভব হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিশোধমূলক নীতির বাস্তবায়ন ধরা পড়ে কোরিয়ান যুদ্ধে- যা তাত্ত্বিকদের সতর্ক করে তোলে। কারণ, কোরিয়ার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়, বরং নব্য কমিউনিস্ট বিপ্লব সম্পন্ন করা চীনও জড়িয়ে পড়ে, যার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পরবর্তীতে পাওয়া যায়। আর কোরিয়ান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অস্ত্র (Conventional Weapons) ও সৈন্যের মাধ্যমে সেরকম সফলতা না দেখায়, তাত্ত্বিকরা সর্বোচ্চ প্রতিশোধমূলক নীতির বিরোধীতা করেন।
১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের জন্যে জেট বোম্বার প্লেন ছাড়া কিছুই ছিলো না।
কিন্তু ১৯৬০ এর দশকে দুটি রাষ্ট্রই ICBM (Intercontinental Ballistic Missile) ও Fusion Warheads উৎপাদন ও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগ করে, যা জাপানে বিস্ফোরিত বোমার চেয়েও হাজার গুনে শক্তিশালী ছিলো। ফলে নিবৃত্তকরণ আরো কঠিন ও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাত্ত্বিকদের মতে, নিবৃত্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে কারণ, যে অস্ত্র মানববিধ্বংসী এবং শত্রুপক্ষও একই অস্ত্র বহন করছে- তা নিয়ে যুদ্ধে নামা সম্পূর্ণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ, নিউক্লিয়ার যুদ্ধে কোন দেশ জয়ী হবে না, বরং দুটি দেশই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, প্রচলিত অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে কোনভাবেই দুটি পরাশক্তির দোদর্ণ্ড প্রতাপ, ও বিশ্বকে দু ভাগে ভাগ করার মানসিকতা থেকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই, বার্লিন ব্লকেড (১৯৪৮-১৯৪৯), কোরিয়ান যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩) ও কিউবা বিপ্লব (১৯৫৯) পৃথিবীতে যথেষ্ট সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলো।
অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভৌগোলিকভাবে সবসময়ই ছিলো প্রতিরোধের অঞ্চল। সে কারণে, রাশিয়ায় কখনই প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণের বিকাশ হয়নি। বরং, স্ট্যালিনের পরে নিকিতা ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় এসে কার্ল মার্ক্স ও লেনিনের ডিফেন্স ডট্রিনের সমালোচনা করেন। মার্ক্স ও লেনিন উভয়েই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সমাজতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘর্ষ অনিবার্য।”
কিন্ত, সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিকভাবে এবং পারমাণবিক শক্তিতে এতোটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, ক্রুশ্চেভ জনসম্মুখে ঘোষণা দেন, “সাম্রাজ্যবাদী কোন রাষ্ট্রের পক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে (সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে) আক্রমণ করা সম্ভবই হবে না।” কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতোটাই ধাঁরালো করেছিলো। তাত্ত্বিকগণ, সোভিয়েতের এহেন প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ ও পশ্চিমের প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে, উভয় রাষ্ট্রেরই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে তাগিদ দেন, যাতে করে- আত্মঘাতী পারমাণবিক আক্রমণের পরেও উভয় রাষ্ট্র পুনরায় একে অপরকে আক্রমণ করার (Second Strike Capability) শক্তিমত্তা অর্জন করতে পারে। এর থেকেই জন্ম নেয় Assured Destruction (AD) অর্থাৎ, নিশ্চিত ধ্বংসযজ্ঞ।
এই ধারণাই পরবর্তীতে, Mutually Assured Destruction (MAD) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, কারণ পারমাণবিক আক্রমণের ফলে উভয় রাষ্ট্রই সমানভাবে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হবে। কিন্তু, এতকিছুর পরও কোন পরাশক্তিই সামরিকভাবে দূর্বলতা প্রকাশ করেনি, বরং দ্বন্দ্ব রূপ নিয়েছে অন্য ধাঁচে, অন্য আঙ্গিকে। পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস জেনে সোভিয়েত প্রিমিয়ার ও মার্কিন রাষ্ট্রপতিরা SALT I ও SALT II (Strategic Arms Limitation Treaty) চুক্তিতে সই করেন, যা উভয় দেশের পারমাণবিক শক্তিমত্তা সমান ভাবে কমাতে সাহায্য করেছিলো। কিন্তু, পারমাণবিক শক্তিমত্তা কমলেও তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি; বরং নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ এ থেকে ‘Limited Nuclear War’ (LNW) ধারণার জন্ম দেন। এর ফলে, সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন ধ্বংসযজ্ঞ (Mutual Assured Destruction) থেকে সীমিত আকারে পারমাণবিক যুদ্ধের ধারণার জন্ম হয়।
অন্যদিকে, মার্কিন মুল্লুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই নিরাপত্তা সমস্যা ছিলো সবচেয়ে বড় সমস্যা। যার ফলে, মার্কিনীরা শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করার চেষ্টা করেছে, জাপান ও পশ্চিম ইউরোপ পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সাহায্য করেছে। একই সাথে এই পশ্চিমা জোটকে নিরাপত্তা দিতে তৈরি করেছিলো ন্যাটো। ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোন শত্রুরাষ্ট্র ন্যাটোভুক্ত কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালালে সকল সদস্য রাষ্ট্র মিলে একযোগে তা প্রতিহত করবে এবং পালটা আক্রমণ চালাবে।
একে নিরাপত্তা অধ্যয়নের ভাষায় বলে, Collective Security কিংবা যৌথ নিরাপত্তা বলয়। ন্যাটোর আবির্ভাব সেকেণ্ড ওয়েভ তাত্ত্বিকদের নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলো। কারণ, নিবৃত্তকরণ তখন আর নিজের নিরাপত্তায় থেমে নেই, বরং তা ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য কোন মিত্র রাষ্ট্রের জন্যেও। এই, মিত্র রাষ্ট্রকে শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে বাঁচানোর যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তাত্ত্বিকগণ সঙ্গায়িত করেছেন Extended Deterrence (ED) হিসেবে। এই সম্প্রসারিত নিবৃত্তকরণের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে নিজস্ব নিরাপত্তা বলয়ে এনেছে।
Third Wave:
সেকেণ্ড ওয়েভ স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রায় সকল নিরাপত্তা সমস্যাই বিশ্লেষণ করেছে। কিন্তু, সেকেণ্ড ওয়েভ থেকে জন্ম নেয়া বেশ কিছু ধারণার সমালোচনা থার্ড ওয়েভ কে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। মূলত, ১৯৭০ এর দশক থেকে থার্ড ওয়েভের যাত্রা শুরু হয়। স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনাময় কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে, Massive Retaliation (সর্বোচ্চ প্রতিরোধ) থেকে Flexible Response (নমনীয় প্রতিক্রিয়া) হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নীতি।
অন্যদিকে, সেকেণ্ড ওয়েভ তাত্ত্বিকদের অনেকেই ন্যাটো জোটের মিত্রদের নিরাপত্তা রক্ষা নিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। শুরু থেকেই সম্প্রসারিত নিবৃত্তকরণ (Extended Deterrence) এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিলো, তবে থার্ড ওয়েভে এই তর্ক আরো জমে ওঠে কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিরাপত্তায় প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করবে নাকি পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াবে, তার কোন আনুষ্ঠানিক নীতি ছিলো না। তবে সময়ের সাথে সাথে মার্কিনীদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়ে প্রভাব বিস্তার (Proxy War) এর কার্যক্রম লক্ষ্য করা গেছে। এর উজ্জ্বল উদাহরণ হলো আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ও সিআইএ কর্তৃক মুজাহিদীনদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী নিবৃত্তকরণ তত্ত্ব, সন্ত্রাসবাস ও সমালোচনা
সন্ত্রাসবাদ ও নিবৃত্তকরণ
স্নায়ুযুদ্ধের পর সবেচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত নিরাপত্তা সমস্যা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। বিশেষত ৯/১১ এট্যাকের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এক উদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শত্রুর না আছে একক কোন রাষ্ট্র, না আছে বিশেষ পরিচয়। ফলে তাত্ত্বিকদের মধ্যে আবারও বিতর্কের সৃষ্টি হয় সন্ত্রাসবাদ ও নিবৃত্তকরণ নিয়ে। মূলত, নিবৃত্তকরণ তত্ত্ব রাষ্ট্রের বিপরীতে রাষ্ট্রের আক্রমণকে মোকাবেলা ও প্রতিরোধে কাজ করে। ফলে, অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠন (Non-State Actors) কে মোকাবেলা করার সুযোগ খুবই কম। এদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তজার্তিকভাবে নিবৃত্তকরণ কাজ না করার বেশ কিছু লজিক দেখিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ। এগুলো হলোঃ
● সন্ত্রাসীদের স্থায়ী কোন ঠিকানা বা নির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্র নেই। ফলে, সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন। সেক্ষেত্রে নিবৃত্তকরণ সম্পূর্ণ অসম্ভব একটি ধারণা। মাঝেমাঝে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়ে, সন্ত্রাসী ধরার জন্যে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয় কিংবা বাউন্টি ঘোষণা করে। কিন্তু এগুলোর কোনটাই প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ বা রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
● সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা— অধিকাংশ সন্ত্রাসীই আত্মঘাতী। কোন আত্মঘাতী মানুষের বিরুদ্ধে কোনপ্রকার হামলা বা আক্রমণের ভয় দেখিয়ে হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়। ফলে, পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষেও সর্বোচ্চ এনকাউন্টার ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ছাড়া আর কোন নিবৃত্তকরণ করা সম্ভব নয়। যেমনঃ ভারতের রেড করিডোর।
● রাষ্ট্রের যেমন পরিচয় আছে, তেমনি কোন কার্যকলাপের দায়ভারও আছে। কিন্তু অধিকাংশ সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে পরিচয় পাওয়া যায় না, কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় অনেক সন্ত্রাসী সংগঠনই নিতে চায় না। ফলে সন্ত্রাসী চিহ্নিতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এবং এর উপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিবৃত্তকরণ যে কোন রাষ্ট্রের জন্যেই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
সমালোচনা
সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের সবচেয়ে ক্ষুরধার সমালোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। এর বহু কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, বিশ্ব আর একক পরাশক্তির অধীনে নেই বরং বহুমাত্রিক ও বহুশক্তির পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে। পারমাণবিক ক্ষেপনাস্ত্রও আর সর্বোচ্চ নিবৃত্তকরণকারী অস্ত্রও নয়, এই স্থান দখল করেছে প্রযুক্তি, তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ও চিপ। ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সমালোচনায়ও এসেছে বহুমাত্রিকতা। একবিংশ শতাব্দীতে নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের উল্লেখযোগ্য কিছু সমালোচনা হলোঃ
● পৃথিবীতে অস্থিতিশীল এবং দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের (Rogue State) সংখ্যা বেড়েছে। এসকল রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরাও অধিকাংশ সময়ে অযৌক্তিক (Irrational) সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে এ সকল রাষ্ট্রের সাথে নিবৃত্তকরণ সম্ভব নয়। যেমনঃ উত্তর কোরিয়া, আসাদ নিয়ন্ত্রিত সিরিয়া, ইসরায়েল, আফগানিস্তান।
● নিবৃত্তকরণ তত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ পুরোটাই ছিলো পারমাণবিক ক্ষেপনাস্ত্র নির্ভর। কিন্তু, বর্তমানে পারমাণবিক শক্তি যুদ্ধ কিংবা সংঘাত প্রতিরোধ করতে পারছে না। নিউক্লিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ছোট বা মাঝারি আকারের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যেমনঃ সমকালীন ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। কিছু গবেষক এ ধরনের প্রবণতাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে সীমা (Nuclear Threshold) কে অস্পষ্টতা হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, কোন রাষ্ট্র ‘কোন’ সীমা লংঘন করলে পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াবে তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, পারমাণবিক যুদ্ধ এড়াতে সংঘাত কমেনি, বরং পরিসংখ্যানের হিসেবে আগের চেয়ে বেড়েছে।
● যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা সংঘর্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিবৃত্তকরণের সাধারণ ধারণাকে সম্পূর্ণ পালটে দিয়েছে। সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও একশন, আগের চেয়ে ৭৫% কম সময়ে সংঘর্ষের মাত্রা বৃদ্ধি করে। যেখানে, মানুষ কেন্দ্রিক নিবৃত্তকরণ ছিলো ধীর ও মন্থর। য্যার ফলে, আগে সংঘর্ষ দানা বাঁধতে সময় লাগলেও, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত সংঘর্ষ বৃদ্ধি করতে পারে। যেমনঃ ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার।
— মুহাম্মদ ইরফান সাদিক
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
No comments