Header Ads

Header ADS

Compellence Theory: চাপ ও হুমকির রাজনীতি

জন এফ কেনেডি এবং নিকিতা ক্রুশ্চেভের মধ্যে Coercive Diplomacy

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শাস্ত্রে ক্ষমতা, বলপ্রয়োগ, হুমকি, এবং কৌশলগত সামরিক আচরণ ও প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Compellence বা বাংলায় ‘বশ্যতা’ একটি মৌলিক ও বেশ জটিল ধারণা। বশ্যতা এমন একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাষ্ট্র বা জোটরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের চলমান কোন আচরণ বা নীতি পরিবর্তন করতে, কোন নির্দিষ্ট কাজে বাধ্য করতে, অথবা বিদ্যমান কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ কিংবা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ কেউ একে প্রাথমিক পর্যায়ে Deterrence বা নিবৃত্তকরণের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করলেও, পরবর্তীতে বশ্যতা আলাদা ধারণা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে এর বিকাশ ঘটেছে।

বশ্যতা মূলত Coercive Diplomacy এর একটি ধরণ, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি সামরিক শক্তির ব্যবহার না করে, হুমকির মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রকে কোন কাজ করতে বাধ্য করে। কূটনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও বশ্যতা সরাসরি সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে, এমনকি কোন বক্তব্য বা কোন রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোন নীতি অন্য রাষ্ট্রের জন্য বশ্যতা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বশ্যতা, নিবৃত্তকরণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও, ধারণাগত ও প্রয়োগগতভাবে ভিন্ন। নিবৃত্তকরণ তত্ত্ব যেখানে রাষ্ট্রের কোন কার্যক্রম প্রথমেই সংগঠিত হওয়া থেকে বিরত রাখে, সেখানে বশ্যতা রাষ্ট্রের চলমান কোন প্রক্রিয়া, আচরণ কিংবা নীতিকে হুমকি, সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে বাধ্য করে। সহজ ভাষায়, নিবৃত্তকরণ কোন ধরনের অযাচিত আক্রমণ প্রতিরোধে মনোযোগী, অন্যদিকে- বশ্যতা রাষ্ট্রের চলমান পরিস্থিতি ও আচরণ পরিবর্তন বা বন্ধ করতে বাধ্য করে।

সংজ্ঞায়ন ও তুলনামূলক পার্থক্য

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক থমাস শেলিং তার বিখ্যাত গ্রন্থ Arms and Influence (1966) এ বশ্যতা কে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘এমন একটি কৌশল যা প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র কে “কোন কিছু করতে বাধ্য করে।” তার ভাষায়: “Compellence is about making someone do something, rather than stopping them from doing something.”  এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বশ্যতা ‘সক্রিয়’ (Active) ও ‘গতিশীল’ (Dynamic) প্রকৃতির, এবং বশ্যতার ফলাফল সবসময়ই পরিবর্তিত কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে নিবৃত্তকরণ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া থেকে বিরত রাখে। নিচে বশ্যতা ও নিবৃত্তকরণের তূলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা হলোঃ

বিষয়

নিবৃত্তকরণ (Deterrence)

বশ্যতা (Compllence)

মূল লক্ষ্য

(Status-Quo) স্বাভাবিক অবস্থা বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। কোনপ্রকার অযাচিত আক্রমণ ঘটার পূর্বেই তা প্রতিহত করা, প্রতিরক্ষা জোরদার রাখা যাতে অযাচিত আক্রমণ না হয়।

অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো, চাপ, হুমকি ও অন্য কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কোন কিছু করতে কিংবা চলমান অবস্থাকে বন্ধ করতে বাধ্য করা।

কখন সংগঠিত হয়

কোন ধরনের আক্রমণ বা হামলা হবার পূর্বেই নিবৃত্তকরণ কাজ শুরু করে।

রাষ্ট্রের কোনপ্রকার পরিবর্তনশীল আচরণ, হামলা, ক্ষমতা বা বলপ্রয়োগ পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষকে তার নীতি ও আচরণ পরিবর্তন করতে কাজ করে।

বৈশিষ্ট্য

সক্রিয় নয়, এবং স্থির।

সক্রিয়, গতিশীল, এবং কোন না কোন পরিবর্তন আনে। সেটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুই-ই হতে পারে।

কাজের পরিধি

মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে কাজ করে।

রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এমনকি সামাজিক ক্ষেত্রেও কাজ করে।

উদাহরণ (ক্ল্যাসিক্যাল)

ন্যাটো জোটের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পশ্চিম ইউরোপে আক্রমণ থেকে বিরত রাখা।

১৮৫৩ সালে জাপানকে জোরপূর্বক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরিতে বাধ্য করা।

উদাহরণ (সমসাময়িক)

পাকিস্তান ও ভারতের সমসাময়িক সীমান্ত সংঘাত (২০১৯), ও পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলা পরবর্তী সময়ে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সংঘাত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক রাশিয়া ও চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা রাষ্ট্রগুলোর ওপর ট্যারিফ বসানো এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক খর্ব করা। এছাড়াও, ট্রাম্প কর্তৃক ইরানে হুমকির মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর থেকে ইরান সরকার কে বিরত রাখা।

 

Compellence ধারণার বিকাশঃ

Compellence বা বশ্যতা ধারণাটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিকাশ লাভ করে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারের পর বশ্যতা প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শাস্ত্রে প্রাধান্য পেতে শুরু করে। গবেষণা অঙ্গনে বশ্যতার বিকাশ পেতে দেরি হলেও, বিশ্বযুদ্ধের পরপরই এর চর্চা শুরু হয়েছিলো। এখানে বলে রাখা ভালো, বশ্যতার ধারণা নিবৃত্তকরণেরও আগে বিকাশ হয়েছিলো। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠা। যার ফলে, আমেরিকার বিশ্বে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো, এবং কোন রাষ্ট্রের ওপর খবরদারি ও বাধ্য করার অধিকার ছিলো। সেই তুলনায় নিবৃত্তকরণের মূল বিকাশ শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার পর। নিবৃত্তকরণ ও বশ্যতা বেশ কাছাকাছি ধারণা হওয়ায় দুটি তত্ত্বই সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে।

কিন্তু, নিবৃত্তকরণের চেয়ে বশ্যতা অনেক বেশি জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ ও আগ্রাসী। কোন রাষ্ট্র পারমাণবিক ক্ষমতাধর হলে, তার অন্য রাষ্ট্রের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে- কারণ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার, একই সাথে এটি পালটা আক্রমণ করার শক্তিও রাখে। ফলে, রাষ্ট্রের যুদ্ধ বা সংঘাতে তুলনামূলক কম জড়াতে হচ্ছে- এটি হচ্ছে নিবৃত্তকরণ, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখে। কিন্তু, বশ্যতা কোন রাষ্ট্রকে হূমকি, আক্রমণ কিংবা অসুবিধাজনক নীতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে তার আচরণ বা নীতি পরিবর্তন করতে সরাসরি বাধ্য করে। তাই আচরণ পরিবর্তন করানো যেমন কষ্টসাধ্য, একই সাথে আচরণ পরিবর্তন করা রাষ্ট্রের জন্যেও অপমানজনক৷ যার ফলে, অনেক সময়ই বশ্যতা ব্যর্থ হয়। কিন্তু, ব্যর্থ হোক বা সফল- বশ্যতা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে, কোনপ্রকার হুমকি বা আক্রমণ কখনই রাজনীতিতে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখে না।

একাডেমিয়ায় বশ্যতা তত্ত্ব হিসেবে স্থান পায় ১৯৬৬ সালে, অধ্যাপক থমাস শেলিং এর বিখ্যাত গ্রন্থ Arms and Influence এর মাধ্যমে। এখানেই প্রথমবারের মতো বশ্যতা কে আলাদা তত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ কালীন সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের আবির্ভাব দুই পরাশক্তির মধ্যকার সরাসরি যুদ্ধকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, ফলে পরাশক্তিগুলো বিকল্প কৌশল হিসেবে বশ্যতা, বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তার ও  ছায়াযুদ্ধ (Proxy War), সরকার পরিবর্তন (Regime Change) ও জবরদস্তিমূলক কূটনীতি (Coercive Diplomacy) এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বশ্যতার প্রয়োজনীয়তা, প্রয়োগ ক্ষমতা, এবং এর কার্যকারিতাকে বাড়িয়ে তোলে। কোন কোন গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসই ছিলো প্রথম ও ক্ল্যাসিক কমপেলেন্সের উদাহরণ। তবে, কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস কে শুধুমাত্র বশ্যতাও বলা যাবে না, নিবৃত্তকরণও বলা যাবে না। এটি ছিলো স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ মূহুর্ত, যেখানে একটি ভূল সম্পূর্ণ পৃথিবীতে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারতো।

মূলত, কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসকে দুটি অংশে ভাগ করলে নিবৃত্তকরণ ও বশ্যতার প্রয়োগ চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমনঃ

ক।            Deterrence বা নিবৃত্তকরণঃ কিউবায় মিসাইল পাঠানোর ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক নিবৃত্তকরণ (Deterrence by Retaliation) নীতির প্রয়োগ করার সুযোগ পায়। যদিও, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কে আস্থাভাজন সকলেই পাল্টা-আক্রমণের পরামর্শ দিয়েছিলো, কিন্তু তিনি বেছে-বেছে সবচেয়ে সরল প্রতিরোধ হিসেবে নৌ-অবরোধ কে বেছে নিয়েছিলেন, এবং এটি সফলও হয়েছিলো। তাই, নিবৃত্তকরণের ইতিহাসেও কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস কে ধরা হয় সবচেয়ে সফলতম উদাহরণ হিসেবে।

খ।            Compellence বা বশ্যতাঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক অস্ত্র কিউবায় পৌছানোর পর, সেই উদ্ভুত পরিস্থিতি কিভাবে ওয়াশিংটন সামাল দেবে তা নিয়ে চলছিলো জল্পনা-কল্পনা। পারমাণবিক যুদ্ধ, সীমিত আকারে যুদ্ধ, পালটা আক্রমণ, কিংবা কিছুই না করা এরকম মোট আটটি অপশনের মধ্যে মার্কিন প্রশাসন নৌ অবরোধকে বেছে নেয়। নৌ-অবরোধ নীতি কার্যকর করার ফলে কিউবা সোভিয়েতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সফল নৌ-অবরোধ থেকে শুরু করে, সোভিয়েত ইউনিয়নকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সময়কালকে বশ্যতার সফল উদাহরণ হিসেবে দেখানো যেতে পারে।

অন্যদিকে, একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যেও এটি সফল উদাহরণ কারণ, সোভিয়েতের কিউবা থেকে অস্ত্র প্রত্যাহারের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তুরস্ক থেকে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে, উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই যুদ্ধে না জড়িয়ে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে উভয় দেশের নিরাপত্তা সংকট কাটিয়ে ওঠা, এবং পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার একটি সফলতম উদাহরণ এটি।

Compellence কেনো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ?

কোন রাষ্ট্রকে সফলভাবে বশ্যতা ও নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ আগ্রাসী ভূমিকা পালন করতে হয়। এর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি, সামরিক প্রস্তুতি, গতিশীল মনমানসিকতা, ও ধাপে ধাপে ধাপে চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা অন্যতম। রাষ্ট্র্বের পক্ষে লম্বা সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাওয়া, চাপ প্রয়োগ করা এবং পালটা চাপ ও আঘাত গ্রহণ করার প্রস্তুতি থাকা বাঞ্ছনীয়। ফলে, বশ্যতা স্বভাবতই অন্যান্য নীতির চেয়ে বেশ ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল প্রক্রিয়া। এটি আরো জটিল হয়ে ওঠে, যদি প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র আক্রমণ ও চাপ সহনশীল হয়। যেমনঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর প্রায় ছয় দশক ধরে অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, কিন্তু কিউবা এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আচরণের পরিবর্তন করেনি। এটি বশ্যতার ব্যর্থ উদাহরণ। বশ্যতাকে সফল করতে হলে প্রতিপক্ষকে দৃশ্যমানভাবে আত্মসমর্পণ বা আচরণ পরিবর্তন করতে হয়, যা রাজনৈতিকভাবে অপমানজনক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপক্ষ চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ়তা বাড়িয়ে তোলে- যা বশ্যতার সম্পূর্ণ গতিপ্রকৃতিকেই আরো জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে।

অন্যদিকে, নিবৃত্তকরণ তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহজ, ও নমনীয়- বিশেষত প্রত্যাখ্যানমূলক নিবৃত্তকরণ (Deterrence by Denial) এর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করলেই আক্রমণের ঝুঁকি কমে আসে। কিন্ত, বশ্যতা নিবৃত্তকরণের অত্যন্ত সরু একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমনঃ সম্পূর্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব কখনই বশ্যতার সুযোগ সৃষ্টি করে না। আবার বিপরীতভাবে, সর্বোচ্চ সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে কোন রাষ্ট্রকে কোন নীতি থেকে বিরত রাখাও বশ্যতার অধীন নয়— সেটা যুদ্ধ। যেমনঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে পারমাণবিক আক্রমণের মাধ্যমে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। এটি কোন বশ্যতা নয়; বরং সম্পূর্ণ যুদ্ধ।

সুতরাং, বশ্যতা এই দুইয়ের মাঝে সরু একটি অংশ যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি সামরিক আগ্রাসন না করে, হুমকি ব্যবহার করে অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে দাবী আদায় করে নেয়। এ কারণেই বশ্যতায় বিশ্বাসযোগ্য হুমকির গুরুত্ব ব্যাপক।

বশ্যতা কার্যকর করার জন্য মোট ৪টি উপাদান প্রয়োজন। এগুলো হলোঃ

·         বিশ্বাসযোগ্য হুমকি (Credible Threat)ঃ শুধু হুমকি বশ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য হুমকির। প্রতিপক্ষ যদি হুমকিতে বিশ্বাস না করে, সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ হুমকি ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে হুমকি সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, কিংবা সম্পর্কের শীতলীকরণ হতে পারে।

·         সুস্পষ্ট দাবী (Demand)ঃ রাষ্ট্রের বশ্যতা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দাবী থাকা প্রয়োজন। দাবী অতিরঞ্জিত বা অলৌকিক হওয়া উচিত নয়, যা প্রতিপক্ষ পূরণ করতে পারবে না। যেমনঃ ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানি সই করলেও তা আদতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটই সৃষ্টি করে। ফলে বশ্যতা ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, দাবী সুস্পষ্ট না হলে সেটা বশ্যতার অধীনে পড়ে না। যেমনঃ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন ও ক্যু। যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন সুস্পষ্ট দাবীর উল্লেখ ছিলো না।

·         সময়সীমা (Deadline)ঃ বশ্যতা কার্যকরের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া জরুরি। সময়সীমা বেঁধে দিলে বিষয়টির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং হুমকি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অন্যথায় হুমকি কেবলমাত্র বিরোধপূর্ণ সম্পর্কেরই সৃষ্টি করে, বশ্যতা না।

·         প্রতিশ্রুতি (Commitment/Assurance)ঃ প্রতিশ্রুতি বশ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কেননা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ধাপে ধাপে চাপ প্রয়োগ করে হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়, প্রয়োগ ক্ষমতা যাচাই করতে হয়। একই সাথে, প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের ওপর দাবী পূরণ হলে চাপ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও দিতে হয়। চাপ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি না থাকলে, সেটা বশ্যতা থাকে না- সরাসরি বৈরিতা বা শত্রুতামূলক আচরণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে দাবীও আদায় করতে হবে, একই সাথে দাবী পূরণ হলে চাপ প্রত্যাহারের সুযোগও রাখতে হবে। অধ্যাপক থমাস শেলিং যুক্তি দেন যে বশ্যতা কার্যকর করতে প্রতিপক্ষের জন্য সম্মানজনক প্রস্থানের একটি দুয়ার খোলা রাখতে হবে। সম্পূর্ণ বৈরিতা বা অপমান বশ্যতা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।

কূটনৈতিক অঙ্গনে এসকল আচরণকে একত্রে সঙ্গায়িত করা হয়েছে Coercive Diplocy বা জবরদস্তিমূলক কূটনীতি হিসেবে। যার অধীনে বেশ কয়েক ধরনের কূটনীতি রয়েছে। যেমনঃ

ক।            গাজর ও কাঠি নীতি (Carrot and Stick Policy) ঃ এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে জোর করে কোন কিছু করতে বাধ্য করা হয়, এবং দাবী পূরণ হলে পুরষ্কার আর দাবী মানা না হলে শাস্তির হুমকি প্রদান করা হয়। যেমনঃ ১৮৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাপান উপকূলে (Gunboat Diplomacy), যার মাধ্যমে জাপানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরিতে বাধ্য করা হয়। দাবী মানা না হলে, সামরিক আগ্রাসনের হুমকি এবং দাবী মানলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

খ।            স্যাংশন ও নিষেধাজ্ঞাঃ স্নায়ুযুদ্ধ কালীন সময় থেকে স্যাংশন ও অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে তার দাবী আদায় করেছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছে, যে কোন আচরণ বা নীতি পরিবর্তন করতে। এর সর্বশেষ সফল উদাহরণ হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যের ওপর ট্যারিফ বসানো। যদিও তা কিছু কিছু দেশের ওপরেই সফল হয়েছে, সার্বজনীনভাবে সফল নয়।

গ।            জবরদস্তিমূলক নীতিঃ জবরদস্তির মাধ্যমে সরাসরি কোন রাষ্ট্রকে তার আচরণ বা নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়, অন্যথায় সামরিক আগ্রাসন বা অর্থনৈতিক অবরোধ সহ নানা হুমকি দেয়া হয়। জবরদস্তিমূলক নীতির সাথে গাজর-কাঠি নীতির মূল পার্থক্য হলো, জবরদস্তিমূলক নীতিতে প্রতিপক্ষকে আচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু আচরণ পরিবর্তনের জন্য কোন পুরষ্কার বা সুবিধা দেয়া হয় না- বরং দাবী না মানলে উলটো আক্রমণের হুমকি দেয়া হয়। এটি যুদ্ধের কাছাকাছি সবচেয়ে আগ্রাসী নীতি। এর বেশ কিছু উদাহরণ হলোঃ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদের কেমিক্যাল অস্ত্রের প্রয়োগ ও বারাক ওবামার ‘সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ (Crossing the Red Line),’ যদিও- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াতে সফল হয়নি।

Compellence -এর সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা ও সমালোচনা

Compellence বা বশ্যতা প্রায়শই বলপ্রয়োগের হুমকির ওপর নির্ভর করে যা উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। আগ্রাসী মনোভাব ও জোরজবরদস্তির কারণে বশ্যতা কার্যকর করাও বেশ কঠিন। নিচে বশ্যতার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থ হওয়ার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলোঃ

·         হিসাবে কিংবা যোগাযোগে ভুলঃ উভয় পক্ষের ভুল ধারণা কিংবা যে কোন পক্ষের থেকে একটু আগ্রাসী মনোভাবই যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

·         ঘরোয়া রাজনীতিঃ শক্ত জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, রক্ষণশীল সমাজ, সাম্রাজ্যবাদী বা কর্তৃত্ববাদী সরকার কোনপ্রকার অপমানজনক বা নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে চাইবে না। এসকল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বশ্যতা অত্যন্ত কঠিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

·         একরোখা নীতিঃ পৃথিবীর বহুরাষ্ট্রই একরোখা নীতিতে চলমান, যাদের ক্ষেত্রে কোনপ্রকার কোন যুক্তি খাটে না। কোন অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক আগ্রাসনের হুমকিতেও এসকল রাষ্ট্রকে টলানো মুশকিল। যেমনঃ ইরান, কিউবা, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া। এসকল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই ব্যর্থ হয়েছে।

বশ্যতার সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, এটি সম্পূর্ণ বলপ্রয়োগের উপর নির্ভরশীল যা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক করে তোলে। অন্যদিকে, আইনগতভাবে বশ্যতা বেশিরভাগ সময়ই আন্তজার্তিক আইন লংঘন করে যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অধ্যাপক ব্যারি বুজান বলেন, বশ্যতা কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য সবচেয়ে বেশি হুমকির। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, অধিকাংশ সময়ই বশ্যতা আন্তজার্তিক আইন ও অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লংঘন করেছে। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বশ্যতার কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা আরো বেড়েছে। এক গবেষণা মতে দেখা গেছে, অধিকাংশ সময়েই বশ্যতা দীর্ঘমেয়াদে শত্রুতা বৃদ্ধি করেছে এবং স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, Compellence বা বশ্যতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি শক্তিশালী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল ও ধারণা। এটি রাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিক কৌশলগত সুবিধা দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতের গভীরতা বাড়াতে পারে। নিবৃত্তকরণের তুলনায় বশ্যতা বাস্তবায়ন অধিক জটিল, কারণ এটি দৃশ্যমান আত্মসমর্পণ বা আচরণ পরিবর্তনের দাবি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একাডেমিক বিশ্লেষণে বশ্যতা ক্ষমতার রুঢ় বলপ্রয়োগের বাইরেও মনস্তত্ত্ব, কূটনীতি, বিশ্বাসযোগ্যতা, ও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবকে সূক্ষ্মভাবে বুঝতে সহায়তা করে।

 

— মুহাম্মদ ইরফান সাদিক 
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সহায়ক গ্রন্থাবলীঃ

Art, Robert J., and Kelly M. Greenhill, eds. Coercion: The Power to Hurt in International Politics. Oxford: Oxford University Press, 2018.

Byman, Daniel, and Matthew Waxman. The Dynamics of Coercion: American Foreign Policy and the Limits of Military Might. Cambridge: Cambridge University Press, 2002.

George, Alexander L. Forceful Persuasion: Coercive Diplomacy as an Alternative to War. Washington, DC: United States Institute of Peace Press, 1991.

Schelling, Thomas C. Arms and Influence. New Haven, CT: Yale University Press, 1966.

Sechser, Todd S. Goliath’s Curse: Coercive Threats and Undeterred Aggression. International Organization 64, no. 4 (2010): 627–60.

 

 

 


No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.