আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ (Arms Control) চুক্তির কার্যকারিতা কতটুকু?
| আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে অস্ত্রের বিস্তার রোধে রাষ্ট্র বা শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংলাপের ভিত্তিতে অনেক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। যেমনঃ ২৫০০ বছর আগে পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ থামাতে এথেন্সের সাথে স্পার্টানরা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করেছিলো। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রুশ-বেগট চুক্তির (১৮১৭) মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তকে অ-সামরিক (Demilitarised) ব্যবস্থাপনায় রূপ দিয়েছিলো। বিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো বিভিন্ন শক্তির মধ্যে। বিংশ শতকের এই নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর মূলে ছিলো পারমাণবিক অস্ত্রের উদ্ভব ও শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কা থেকে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধকালে রাষ্ট্রগুলো ব্যাপকভাবে অস্ত্রের বিস্তার ঘটিয়েছিলো- পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধের অস্ত্র উভয়েরই বিস্তার ঘটানো হচ্ছিলো, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, রাষ্ট্রগুলোর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলো। |
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিরস্ত্রীকরণের (Disarmament) থেকে অনেকটাই আলাদা একটি বিষয়। নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার অস্ত্রের বিনাশ ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শান্তি স্থাপনের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। অন্যদিকে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বলতে একটি আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে বুঝায়। যেখানে নিরস্ত্রীকরণের মূল লক্ষ্যই থাকে একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার বিকাশ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতি সেখআনে বর্তমান ব্যবস্থার খানিক পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি ভারসাম্য অবস্থা তৈরির চেষ্টা চালায়। পাশাপাশি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র বিস্তারে সম্মতি দিয়ে থাকে।
অস্ত্র বিস্তার অনেকগুলো পন্থায় নিয়ন্ত্রণ ঘটানো যায়, এবং কৌশলগত কারণে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো তাদের কর্মপন্থাও আলাদা আলাদা রেখেছে। যথাঃ
·
যুদ্ধের ক্ষেত্রে যে ধরনের অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয় সেগুলোর একটা নির্দিষ্ট অংশ সীমিত বা ধ্বংস করে ফেলা;
·
যুদ্ধের সময় যেসকল অস্ত্রগুলো মজুদ রাখা হয়, এগুলোর মধ্যে যে অস্ত্রগুলোর প্রভাব ধ্বংসাত্মক সেগুলো সীমিত করা;
·
যুদ্ধে সামগ্রিক আকারে যে অস্ত্র মজুদ রাখা হয়েছে তার একটা বড় অংশ হ্রাস করা;
·
এমন ধরনের অস্ত্র-প্রযুক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেগুলো যুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে;
·
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত সমাধানের চেষ্টা করা ইত্যাদি।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো সাধারণত যে কাজগুলো করে থাকে। যথাঃ
1.
কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্র ও অস্ত্র ব্যবস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে;
2.
রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অস্ত্র বিস্তারের যথেষ্ট সুযোগ প্রদান করে;
3.
যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা;
4.
যে অস্ত্রের বিস্তার যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয় সেগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা; এবং
5.
অস্ত্র বিস্তারের প্রযুক্তিগুলোর বিকাশে বাধা প্রদান করা।
১৯৪৫ পরবর্তীআন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো মূলত পারমাণবিক, কেমিক্যাল ও বায়োলোজিকাল অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর জন্যই সম্পাদিত হচ্ছিলো, কিন্তু এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্রগুলো থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলো এন্টি-ব্যালেস্টিক মিশাইল ব্যবস্থার সুচনা ঘটালো এবং শক্তিধর দেশগুলো বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তির পরীক্ষা চালানো শুরু করলো, তখন থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনেকটা চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় পরে যায়। যা-ইহোক, বিংশ শতকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির উদাহরণ নিচে দেয়া হলঃ
1.
The 1924 Geneva Protocol: অস্ত্রে গ্যাস ও জীবাণু ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
2.
The 1959 Antarctic Treaty:
এনার্কটিক মহাদেশে যেকোনো ধরণের সামরিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ;
3.
The 1968 Nuclear Non-Proliferation Treaty (NPT): যেকোনো ধরণের পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ;
4.
The 1972 Biological Weapons Convention: যেকোনো ধরনের বায়োলোজিকাল অস্ত্র তৈরি ও প্রক্রিয়াজাত করণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ;
5.
The 1972 Strategic Arms Limitation Talks (SALT 1):
এন্টি ব্যালেস্টিক মিশাইলের উৎপাদনের উপর নজিরদারি বৃদ্ধি এবং এর ব্যবহারে নিয়ম কানুন আরোপ করা;
6.
The 1989 Conventional Forces in Europe (CFE) TreatyTreaty:
ইউরোপে প্রচলিত অস্ত্রের পরিধি সীমিতকরণ
7.
The 1991-2 Strategic Arms Reduction Talks (START 2):
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসকরণ;
8.
The 1993 Chemical Weapons Convention: এই চুক্তির স্বাক্ষরদাতা দেশগুলো পরবর্তী এক দশকের মধ্যে তাদের রাসয়নিক অস্ত্রগুলি ধ্বংস করবে;
9.
The 1998 Antipersonnel Landmines Treaty (APLT): সকল ধরনের ল্যান্ড মাইনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইত্যাদি।
কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো খুব সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। এই চুক্তিগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক দুঃশ্চিতার প্রশমন ঘটাতে ততটা সফল হয়নি। এর অন্যতম কারণ হল এই দুই মহাশক্তির চুক্তির অনুচ্ছেদগুলো না মেনে চলা এবং বারংবার কৌশলগত ও কূটনৈতিক ছলনার আশ্রয় নেওয়া। বেশিরভাগ সময় তারা তাদের মজুদকৃত অস্ত্রের সঠিক হিসেব প্রকাশ করেনি, গোপনে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা চালিয়ে গিয়েছেন, এবং প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের অস্ত্র ব্যবসাকে চাঙ্গা রেখেছেন। পাশাপাশি তারা সবসময়ই তাদের সামরিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে অসহযোগিতা করছেন। এমনকি স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যেও তাদের স্থাপনাগুলোর উওঅঅর নজরদারি করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। এভাবেই অন্যান্য দেশ চুক্তিগুলোর উপর তাদের আস্থা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে।
আরও একটা সমস্যা সামনে আসে যখন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষরদাতা কিছু সামরিক শক্তিধর দেশ সেই চুক্তিগুলো থেকে বের হয়ে আসে। যেমনঃ ১৯৯৩ সালের রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও সে গোপনে রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি চালিয়ে গিয়েছিলো, পরবর্তীতে ব্যাপারটি প্রকাশিত হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে এককভাবে বের হয়ে আসে যা অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর জন্য একটা পথ খুলে দেয়।
এখন প্রশ্ন থেকেই যায় কিভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন সার্বভৌম দেশের ক্ষেত্রে এই আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর সফল বাস্তবায়ন ঘটাবেন? সরাসরি সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করতে পারেন, অথবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন, কিন্তু সফলতা খুবই কম দেখা যাবে সেক্ষেত্রে। ক্ষুদ্র দুর্বল ৩য় বিশ্বের দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেকোনো ধরণে চাপ সহজে দিতেই পারেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনের মত দেশগুলোর ক্ষেত্রে তারা কী করবেন এই প্রশ্ন থেকেই যায়। যাইহোক, ৩য় বিশ্বের দুর্বল দেশগুলো সমালোচনার চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই শক্তিশালী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের ব্যাপারে জো দিয়ে থাকেন। যুদ্ধ বা সংঘাতের ফলাফল বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক রূপ নেয় যা আমরা এই শতাব্দীর ইরাক ও ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেই বেশ বুঝতে শিখেছি। আশাকরি শক্তিধরদেরও একই বোধদয় হবে, এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা ভারসাম্য অবস্থা সবসময় বঝায় থাকবে।
অনুবাদকঃ বদিরুজ্জামান
মূল বইঃ International Relations Key Concepts
।।।।।।


No comments