ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের দার্শনিক ভিত্তি
![]() |
| রিয়ালিজম দর্শনের তিন প্রবক্তা: থমাস হবস, নিকোলো ম্যাকেয়াবেলি ও থুকিডাইডিস |
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রিয়ালিজম তত্ত্বটি রাষ্ট্রকে কেন্দ্রীয় কর্মক বা কর্তা হিসেবে বিবেচনা করে। তত্ত্বটি নানান দেশের মেশালে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেখানে কোন কেন্দ্রীয় সরকার বা কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিকে চিরায়ত ধরে নেয়। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নৈরাজ্য বা বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। রিয়ালিজম তত্ত্বমতে, এই নৈরাজ্যপূর্ণ পরিবেশে রাষ্ট্র নিরাপত্তা সংকটে ভোগে।
এই অনিরাপত্তা কাঁটিয়ে ওঠার উপায় প্রধানত একটি- রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। কিন্তু শক্তিশালী হওয়ার যে কাঁচামাল প্রয়োজন যেমনঃ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান প্রভৃতি ও এগুলোর যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতা রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সমানভাবে থাকে না।
ফলস্বরূপ, নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থায় কিছু রাষ্ট্র অন্যের তুলনায় অধিক শক্তিশালী বা হেজমন হয়ে ওঠে, এবং দুর্বল রাষ্ট্রের থেকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ আদায় করতে চায়। দুর্বল শক্তি সেক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা ও শক্তিধরের শোষণ থেকে বাঁচতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামরিক জোট বা এলাইয়েন্সে যোগদান করে। জোটে যোগদান দুর্বল রাষ্ট্রকে শক্তিশালী/হেজমনের বিপরীতে শক্তিসাম্য (Balance of Power) অর্জনে সাহায্য করে। এভাবেই আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যপূর্ণ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা বা স্থিতিতাবস্থা বজায় থাকে।
অতএব, রিয়ালিজম তত্ত্ব অনুসারে, একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, এবং তার বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার কেন্দ্রে থাকবে দুইটি নীতিঃ
১। রাষ্ট্রটি শক্তিশালী হলে যেমনঃ যুক্তরাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা বৈদেশিক নীতি হবে নিজের নিরাপত্তা অর্জনের সাথে সাথে অন্য রাষ্ট্র থেকে রাজনৈতিক স্বার্থ আদায় করা, এবং
২। রাষ্ট্রটি দুর্বল হলে যেমনঃ বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি হবে নিজের নিরাপত্তা অর্জনের সাথে সাথে নৈরাজ্যপূর্ণ ব্যবস্থায় শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিপরীতে নিজের টিকে থাকা নিশ্চিত করা।
মোটাদাগে, এটাই রিয়ালিজম তত্ত্বের মূলভাষ্য।
রিয়ালিজম তত্ত্বের প্রেক্ষাপটঃ
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব হিসেবে বিকশিত হওয়ার অনেক আগে দর্শন হিসেবে রিয়ালিজম যাত্রা শুরু করে। প্রাচীন গ্রিসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই রিয়ালিজম দর্শনকে তৎকালীন নগররাষ্টের আন্তঃনাগরাষ্ট্রিক অর্থাৎ এক নগররাষ্ট্রের সাথে অন্য নগররাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিচালনার মৌলিক আদর্শ বা নীতি হিসেবে প্রাধান্য দিতেন। রিয়ালিজম তত্ত্বের প্রাথমিক প্রেক্ষাপটে থুকিডাইডিস অগ্রণী ভূমিকা পালণ করেন। থুকিডাইডিসের লেখা, বিশেষত তার পেলোপেনসিয়ান যুদ্ধ গ্রন্থটি তৎকালীন আন্তর্জাতিক বা হেলেনিক সভ্যতা কেন্দ্রিক নগররাষ্ট্রিক ব্যবস্থার এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
রিয়ালিজম আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব হিসেবে বিকাশের ক্ষেত্রে থুকিডাইডিসের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। থুকিডাইডিসের লেখাগুলো থেকে চারটি বিষয়কে পরবর্তীতে, রিয়ালিজম তত্ত্বের প্রবক্তরা, রিয়ালিজম তত্ত্বের মৌলিক ধারণা বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করেন [১]। যথাঃ রাজনৈতিক ভাগ্য, প্রয়োজনীয়তা ও নিরাপত্তা, টিকে থাকা, এবং সুরক্ষা।
গ্রিক দার্শনিক থুকিডাইডিসের বিখ্যাত গ্রন্থ “পেলোপেনসিয়ান যুদ্ধ” কে- ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা “নৈরাজ্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা”-এর দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। থুকিডাইডিস রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের অনুসারী ছিলেন। তিনি এরিস্টটলের বিখ্যাত উক্তি, “মানুষ প্রকৃতিগত বা সহজাত বা জন্মগতভাবে রাজনৈতিক জীব”- এর সমর্থক ছিলেন। তবে থুকিডাইডিসের মতে মানুষের রাজনৈতিক প্রকৃতি শক্তির দ্বারা নির্ধারিত হয়, এবং সেই শক্তি স্বাভাবিকভাবেই অসম আঁকারে বিরাজ করে।
সে বিবেচনায় থুকিডাইডিস তার “পেলোপেনসিয়ান যুদ্ধ” গ্রন্থে তৎকালীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে অসম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নগররাষ্ট্র এই সত্যকে তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য হিসেবে মেনে নেয়। এই মেনে নেওয়া স্বভাবতই দুর্বল ও ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের বৃহৎ শক্তির বিপরীতে টিকে থাকা ও সমৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক হয়। ফলে, প্রাচীন গ্রিসের ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থেই তৎকালীন তিন মহাশক্তি- এথেন্স, স্পার্টা ও পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে জোট বাঁধে, এবং একে অন্যের বিরুদ্ধে (এথেন্স বনাম স্পার্টা, স্পার্টা বনাম পারস্য ইত্যাদি) ম্যারাথন পেলোপেনসিয়ান যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
এছাড়াও, প্রকৃতিগতভাবে অসমতা ও অনিরাপত্তা প্রশমনে থুকিডাইডিস বৈদেশিক নীতি গ্রহণের সময় সতর্কতা ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের ব্যপারে জোর দিতে বলেছেন। থুকিডাইডিসের মতে, আন্তনগরাষ্ট্রিক সম্পর্ক পরিচালনায় দূরদর্শি, দক্ষ, যৌক্তিকতা ও সতর্কতামূলক বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
ম্যাকেয়াভেলির বিচক্ষণ রাজাঃ
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ‘দ্যা প্রিন্স” গ্রন্থটির জন্য একই সাথে বিখ্যাত ও কুখ্যাত। তিনি মনে করতেন প্রতিপক্ষ শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিপরীতে টিকে থাকাই একটি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তার ভাষায়, সামরিক সাক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যেমে এই টিকে থাকা নিশ্চিত হয়। তবে রাজার রাজ্য পরিচালনার বিচক্ষণতা বা কৌশলী হওয়াকে ম্যাকেয়াভেলি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার মতে, রাজার বিচক্ষণতা দুটি বৈশিষ্ট্যে প্রকাশ পায়। যথাঃ
(১) সক্ষমতা (Power) যাকে ম্যাকেয়াভেলি সিংহের (Lion) সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, তার মতে, রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে রাজাকে সিংহের মত সাহসী ও শক্তিশালী হতে হবে।
(২) ঠগি (Decieve) যাকে ম্যাকেয়াভেলি শৃগালের (Fox) সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, তার মতে, রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে রাজাকে শিয়ালের মতন চালাক হতে হবে; ঝামেলা থেকে দূরে থাকবে এবং প্রয়োজনে ধোকা দিতেও পিছপা হবে না।
অতএব, ম্যাকেয়াভেলির মতে, কোন রাজা প্রেক্ষাপট অনুসারে শক্তি প্রয়োগ বা ধোকার সাহায্যে নিজের নিরাপত্তা ও টিকে থাকা নিশ্চিত করতে পারে। তার মতে, বিশ্ব ব্যবস্থায় অনিরাপত্তা (ভয়) বা সুযোগ দুটিই বিদ্যমান। তিনি বলেন, রাজার আচারণ অর্থাৎ, রাজ্যের বৈদেশিক নীতির প্রকৃতির উপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সুযোগ আদায়ের সক্ষমতা নির্ভর করে।
ম্যাকেয়াভেলির ভাষায়, রাজাকে সবসময় যৌক্তিকতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক নৈতিক আদর্শ থেকে দূরে থেকে শক্তি, স্বার্থ, সুযোগ ও নিরাপত্তা অর্জনে চাতুরতা, প্রয়োজনে সংঘাতে লিপ্ত হতে হবে। অর্থাৎ, তিনি রাজ্যকে একটি নৌকা, এবং রাজাকে নৌকার মাঝির সাথে তুলনা করা যায়। যেখানে নৌকার (রাজ্যের) ও নৌকার যাত্রীদের (নাগরিকদের) টিকে থাকা মাঝির বিচক্ষণতা (শক্তি ও চাতুরতা) ও কম্পাসের (বৈদেশিক নীতি) উপর নির্ভর করবে।
হবসের সার্বভৌম রাষ্ট্র চুক্তিঃ
থমাস হবসের “লেভিয়াথান” গ্রন্থটি রিয়ালিজম তত্ত্বের অন্যতম দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেখানে থুকিডাইডিস আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে একক (বড় থেকে শুরু) ধরে; ম্যাকেয়াভেলি দ্যা প্রিন্স গ্রন্থে রাজা বা রাজ্য একক ধরে (মধ্য থেকে শুরু) বিশ্লেষণ শুরু করেন; হবস সেখানে ব্যক্তিকে (নিচ থেকে শুরু) একক ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে জোর দেন।
থমাস হবসের ভাষায় প্রতিটি মানুষই স্বাধীন ও স্বার্থপর। সমাজে টিকে থাকার প্রয়োজনে মানুষ একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে। যখন সমাজে সকল মানুষের টিকে থাকার মন্ত্র প্রভাব বিস্তার করা, তখন সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে যায়, সমাজ জংগলে রূপ নেয়। তবে এই নৈরাজ্য এক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে ফলে তারা সামাজিক চুক্তিতে উপনিত হয়।
হবস বিষয়টিকে এভাবে বলেন যে জংগলে যখন সবাই হিংস্র ও অন্যকে হত্যা করে নিজের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই গোটা জংগলের কেউ-ই নিরাপদ থাকেনা। এহেন পরিস্থিতিতে তারা লেবিয়াথান নামক দৈত্যের সাথে চুক্তি করে: দৈত্য তাদের নিরাপত্তা দিবে, বিনিময়ে সকলেই দৈত্যের সামনে নতজানু হবে।
এই উপকথাকে হবস পরবর্তীতে রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নিয়ে আসেন। অর্থাৎ, নৈরাজ্যপূর্ণ সমাজ থেকে বাচতে তারা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনে মনোনিবেশ করেন, যে প্রতিষ্ঠানটি সমাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এবং বিনিময়ে সমাজের মানুষ প্রতিষ্ঠানকে সর্বময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন, এবং তার নীতি ও কাজের প্রতি অনুগত থাকবে।
হবসের ভাষায় আধুনিক রাষ্ট্রই হল সেই প্রতিষ্ঠান যাকে মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতা দিয়েছেন, বিনিময়ে সে রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও টিকে থাকা নিশ্চিত করবে।
মূল্যায়ণ:
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্লাসিক্যাল ও নিও-রিয়ালিজম তত্ত্ব দুটি তাদের দার্শনিক যাত্রায় প্রাচীন গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থুকিডাইডিস, রেনেসাঁ যুগের কুটনীতিবিদ নিকোলো ম্যাকেয়াভেলি ও রোমান্টিক যুগের দার্শনিক থমাস হবসের বাস্তববাদী দর্শনের থেকে অনুপ্রাণিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব হিসেবে ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের প্রবক্তা হ্যান্স জি মরগেনথুর সিক্স প্রিন্সিপালে উপরোক্ত তিন দার্শনিকের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
অতএব, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম তত্ত্বের যে যে দিকগুলো রিয়ালিজম দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত:
> থুকিডাইডিসের আন্তনগররাষ্ট্র ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। ক্লাসিক্যাল রিয়ালিস্টরাও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নৈরাজ্যপূর্ণ মেনে নিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জনের কথা বলেছেন।
> ম্যাকেয়াভেলির দ্যা প্রিন্সের আদলে ক্লাসিক্যাল রিয়ালিস্টরা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন ও রাষ্ট্রের আচারণে যৌক্তিশীলতা ও চাতুরতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। শক্তি অর্জনকেই রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
> হবসের লেবিয়াথান ধারণাকে ক্লাসিক্যাল রিয়ালিস্টরা যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। তারা হবসের সুরে সুর মিলিয়ে মানুষের রেশনাল বা স্বার্থপরতাকে স্বীকার করেন। এবং রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ পরিচালনার একক রূপকার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, সেখানে অন্য কোনো কর্মকের জায়গা থাকবে না।
To be continued.....
লেখক:
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


No comments