লিবারেলিজমঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের সূচনা
লিবারেলিজমঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের সূচনা
আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক অর্থাৎ এক রাষ্ট্রের বা জাতির সাথে অন্য রাষ্ট্রের বা জাতির সম্পর্ক কেমন হচ্ছে,
কেমন হবে বা কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদির বর্ণনা, ব্যাক্ষা, বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক তত্ত্ব থেকে পাওয়া যায়। দার্শনিক ক্ষেত্র হিসেবে তত্ত্বগুলোর বর্ণনা বা বিশ্লেষণে
বৈচিত্র লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ, তত্ত্বকে সানগ্লাস হিসেবে ধরলে, সানগ্লাসের রঙের বৈচিত্র
অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যায় ভিন্নতা আসে।
সে
বিবেচনায়, লিবারেলিজম বা উদারতাবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রথম সানগ্লাস, এবং এই গ্লাস
পরিহিত পাঠক বা বিশ্লেষক বা নীতি নির্ধারক আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে শান্তি ও সহবস্থানের
উর্বরক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ, লিবারেলিজম তত্ত্ব মনে করে, সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধির
সাহায্যে আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যকর ব্যবস্থায় শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব।
লিবারেলিজম কী?
Liberalism
বা উদারতাবাদের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্র কেন্দ্রিক পরিচালিত হয় না।
অ-রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সত্তা যেমনঃ আন্তর্জাতিক সংস্থা, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি
সংস্থা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সম্প্রদায়, এমনকি সাধারণ নাগরিকের প্রেক্ষিতেও
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হতে পারে। অর্থাৎ, লিবারেলিজম বহুমুখী দর্শনের (Pluralism)
নিরিখে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে দেখিয়ে থাকে।
যেমনঃ
যদি স্নায়ুযুদ্ধকালে গড়ে ওঠা ন্যামের (Non-Alignment Movement) কথা বলি, আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক পরিচালনায় শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে কয়েক বিখ্যাত ব্যক্তির
(মার্শাল টিটো, নক্রুমা, জওহরলাল নেহরু, সুকার্ন প্রভৃতি) প্রচেষ্টায় নিরপেক্ষ জোট
হিসেবে ন্যাম যাত্রা শুরু করে। আবার যদি রাষ্ট্রের ভিত্তিতে বলি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
পরবর্তী দেশগুলোর সংঘাতহীন বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষর ও লীগ
অব নেশনস প্রতিষ্ঠা করে।
লিবারেলিজম দর্শন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব হিসেবে আদর্শ, মূল্যবোধ, মুক্তি, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রভৃতিকে গুরুত্ব দেয়। লিবারেলিজম তত্ত্বে, রাষ্ট্রের বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরাপত্তায় সামরিক হুমকিকেই একক নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা না করে, পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, মানব ও মাদক পাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিপর্জয়, অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতিকেও সম্পর্কের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
লিবারেলিজম তত্ত্বের প্রেক্ষাপটঃ
লিবারেলিজম
তত্ত্বের সাথে গুলিয়ে ফেলা অন্য তত্ত্বটি আইডিয়ালিজম বা আদর্শবাদ। লিবারেলিজম তত্ত্বটির
সূচনা এনলাইটেনমেন্ট যুগে হলেও, আদর্শবাদের সূচনা প্রাচীন গ্রিক দর্শন থেকে। লিবারেলিজম
প্রধানত একটি রাজনৈতিক দর্শন বা তত্ত্ব, কিন্তু আদর্শবাদের বিস্তার সমাজ বিজ্ঞানের
বিভিন্ন শাখায় লক্ষণীয়। সে বিবেচনায়, আদর্শবাদ দর্শনের অনেক বিষয় লিবারেলিজম বা উদারতাবাদ তত্ত্বটি গ্রহণ করেছে।
ইউরোপীয়ান
এনলাইটেনমেন্ট যুগে রাজা ও চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে উদারতাবাদ ধারণাটির
শুরু হয়। লিবারেলিজম তত্ত্বে রাজার ক্ষমতায় সীমা টেনে ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠার
করার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়। ইউরোপে প্রজানন্ত্রের বিকাশ ও মুক্ত বাণিজ্য প্রসারে উদারতাবাদের
বড় ভূমিকা রয়েছে। জন লক, মন্টেস্কু, ইমান্যুয়েল কান্টের মত প্রভাবশালী দার্শনিকেরা
উদারতাবাদের ভিত মজবুত করেছেন।
এছাড়াও, ইউরোপের
দীর্ঘ যুদ্ধাংদেহী প্রথার প্রভাবে ইউরোপের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নাজুক হয়ে পরে। রাষ্ট্রের
স্বার্থ আদায়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগ যুদ্ধের প্রবনতা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের
ভয়ানক অভিজ্ঞতায় ইউরোপীয় শক্তিগুলো সমস্যা সমাধানে সংঘাতের বদলে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির
প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, এবং সমন্বয়ের সাহায্যে রাষ্ট্রগুলো সে পদ্ধতি অনুসরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
হয়। ভার্সাই চুক্তি ও লীগ অব নেশনস সে প্রতিজ্ঞারই ফসল। পাশাপাশি, ১৯২০ সালে, আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক পাঠ্যক্রম হিসেবে যাত্রা করে, এবং উদারতাবাদ সেই অধ্যায়ণের প্রথম তাত্ত্বিক
সানগ্লাস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
লিবারেলিজম
যে ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছেঃ
১। ব্যক্তি-স্বাধীনতাঃ
ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের সাথে ক্লাসিক্যাল লিবারেলিজম তত্ত্বের একটি ্মৌলিক পার্থক্য- রিয়েলিজম যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একক ও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে রাষ্ট্রকে বেঁছে নেয়, লিবারেলিজম সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যক্তিকে ও ব্যক্তি স্বাধীনতা বা অধিকারকেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করে। লিবারেলিজমের ভাষায় ব্যক্তির সমন্বয়ে রাষ্ট্র তৈরি হওয়ায়, ব্যক্তির আচারণ রাষ্ট্রের আচারণকে প্রভাবিত করে। উদারবাদীরা বলেন মানুষ একটি রেশনাল বা যৌক্তিক ও উন্নত প্রাণী হওয়ায় তারা পারস্পারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তি ও সহযোগিতাকে প্রাধান্য দেয়। ঠিক সেই মানুষ দ্বারা যেহেতু রাষ্ট্র গঠিত ও পরিচালিত হয়, রাষ্ট্রও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় পারস্পারিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
২। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা:
উদারবাদী দার্শনিকরা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যথাসম্ভব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরে গুরুত্ব দেন। একটা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি তার বাহ্যিক আচরণকে প্রভাবিত করে; রাষ্ট্র পরিচালককে হীন রাজনৈতিক স্বার্থে আকর্ষিত করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনসম্মতির প্রয়োজন পড়ে, এবং রাষ্ট্রীয় নীতির আলোচনা-সমালোচনা সেখানে প্রাধান্য পায়। ফলে রাষ্ট্র জনকল্যাণমুখী পলিসি গ্রহণ করে। দার্শনিক জন লক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক আদলে সাজাতে বলেছেন। যখন রাষ্ট্রগুলোর ভিতরে গনতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটবে, তখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সংঘাত নিরসনে তারা শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সহযোগিতাকে বেছে নেবে। ফলে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত বা সংকট এড়ানো সম্ভব হবে।
৩। আন্তর্জাতিক সংস্থা:
রিয়েলিজম তত্ত্বের ন্যায়, লিবারেলিজম তত্ত্বও স্বীকার করে নেয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নৈরাজ্যকর। উদারবাদী দার্শনিক যেমন জন লক, থমাস হবস ও জ্যা জ্যা রুশোর প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধরে তাদের রাজনৈতিক দর্শনের ব্যাক্ষা করেছেন। অর্থাৎ, হবস ও রুশোর নৈরাজ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশে যেখানে প্রাণী (মানুষ) অন্যকে দমিয়ে/হত্যা/দুর্বল করে নিজেদের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে চায়, লকের প্রাকৃতিক পরিবেশের নৈরাজ্য থেকে বাচতে মানুষ সৌহার্দ্য, সহযোগিতা ও সমন্বিত পদক্ষেপ অবলম্বন করে। এই ভিত্তিকে পুজি করে উদারবাদীরা বলতে থাকেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার যে নৈরাজ্যকর পরিবেশ যা কোন অথরিটির অভাবে তৈরি হয়েছে, কোন গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই নৈরাজ্য কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
৪। আন্তর্জাতিক আইন:
উদারবাদ তত্ত্ব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরজ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মূল্যবোধ, প্রথা ও আইনের যথাযথ ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জন লকের ভাষায়, প্রাকৃতিক পরিবেশে যে প্রাণীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, তাদের শৃঙ্খলায় আনতে কিছু নিয়ম তৈরি করতে হয়। কিন্তু যে প্রাণী (মানুষ) নিয়মভঙ্গ করে পরিবেশের শান্তি নষ্ট করতে চাইবে তাকে সমন্বিতভাবে চিড়িয়াখানায় আবদ্ধ করে রাখতে হবে।
উদারবাদ তত্ত্বানুসারে, আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্যে রাষ্ট্রের আচারণকে প্রভাবিত করা যায়। বিভিন্ন চুক্তি ও প্রথা রাষ্ট্রের পারস্পারিক সম্পর্কের গতি নির্ধারিত করে দেয়, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন একটা সীমানা টেনে দেয়।
৫। সমন্বিত নিরাপত্তাঃ
উদারবাদী তত্ত্ব এটা স্বীকার করেছেন যে নৈরাজ্যকর বিশ্ব ব্যবস্থায় যে সব রাষ্ট্রই উদারবাদী দর্শনের অনুগত হবে, অর্থাৎ, শান্তি, শৃঙ্খলা ও সহযোগিতার দরুন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে তা নাও হতে পার। কোন কোন রাষ্ট্র নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ে স্বেচ্ছাচারী বা যুদ্ধাংদেহী আচারণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্র অন্যের জন্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই হুমকি/সংঘাত/সংকট নিরসনে শান্তিপ্রিয় দেশগুলো সম্ন্বিয়ভাবে নিরাপত্তা অর্জনে জোর দেন। এক্ষেত্রে দেশগুলো সামরিকভাবে বা অর্থনৈতিক অবরোধর মধ্য দিয়ে হুমকিদাতা বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রের আচারণে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। যেমন: ইরাকের কুয়েত দখল আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি হওয়ায় গালফ যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ অবলম্বন করা হয়।
৬। অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা:
ক্লাসিক্যাল আদর্শবাদ থেকে উদারবাদী তত্ত্ব্বের একটি পার্থক্যের জায়গা অর্থনীতি। লিবারেলিজম তত্ত্ব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নৈরাজ্য প্রশমনে ও শান্তি বিকাশে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন৷ তত্ত্বমতে, রাষ্ট্র যখন সম্পর্ক পরিচালনায় রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়, তখন সেখানে শক্তির প্রসঙ্গ চলে আসে। আর যখন শক্তির বিষয়টি আসে, তখন সংঘাত বা যুদ্ধের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সে বিবেচনায়, রাষ্ট্র যখন অর্থনীতি বা বাজার নির্ভর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় মনোযোগী হবে, তখন পারস্পরিক স্বার্থ আদায় হবে, সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে, আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটব, এভাবেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শান্তি বিরাজ করবে।


No comments