Header Ads

Header ADS

ন্যাটো ও ইউক্রেন যুদ্ধঃ সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ

NATO


ন্যাটো সৃষ্টির ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে, বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে আঞ্চলিকতাবাদের (regionalism) অথবা আঞ্চলিক সংস্থা সৃষ্টির ব্যাপক উত্থান শুরু হয়। এর বেশ কয়েকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (অর্থনৈতিক), নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) (সামরিক), আরবলীগ (রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক), আসিয়ান (অর্থনৈতিক) ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, সমগ্র পৃথিবী দুটি বৃহৎ পরাশক্তির বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপাশে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক জোট, অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জোট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জোটভুক্ত রাষ্ট্রগুলো- সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার রোধ করতেই, ১৯৪৯ সালের ০৪ এপ্রিল ন্যাটো প্রতিষ্ঠা করা হয়।   

ন্যাটো প্রতিষ্ঠার কারণ

ন্যাটো পশ্চিম ইউরোপীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক জোট, যা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সোভিয়েত পরাশক্তির প্রভাব, সম্প্রসারণ, ও বিস্তার রোধে ইউরোপে ব্যবহার হয়েছিলো। অন্যদিকে, তৎকালীন সময়ে এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার রোধে ন্যাটোর আরেকটি এশিয়ান শাখা SEATO (সাউথ ইস্ট এশিয়ান ট্রিটি অর্গানাইজেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৭৭ সালের ৩০ জুন ভেঙে যায়। SEATO সময়ের সাথে সাথে ভেঙে গেলেও, NATO এখনও কর্তৃত্বের সাথে টিকে আছে।   

ন্যাটো প্রতিষ্ঠার বেশকিছু কারণ ছিলো। যেমনঃ

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, জার্মানি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে পূর্ব জার্মানি একটি সোস্যালিস্ট স্টেটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে পশ্চিম জার্মানি একটি ক্যাপিটালিস্ট ডেমোক্রেটিক স্টেটে পরিণত হয়। বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ৩ বছর পর, ১৯৪৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের অংশ হিসেবে, ২৪শে জুন জার্মানির বার্লিন শহরে ব্লকেড দেয়, যা বার্লিন ব্লকেড নামে পরিচিত।

বার্লিন শহর পশ্চিমাদের অংশ হওয়া সত্ত্বেও, এর চারপাশ ছিলো সোভিয়েতের দখলে। যার ফলে, সোভিয়েত সেনা ছাউনি ডিঙিয়ে পশ্চিমাদের সেখানে কোনপ্রকার প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যার ফলে, শহরটিতে তীব্র খাদ্যসঙ্কট দেখা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এ উদ্ভুত পরিস্থিতি রুখতে এক বছরে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিমানযোগে বার্লিনে পৌছে দেয়। বার্লিন ব্লকেড নীতি অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং ১২ই মে, ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্লকেড খুলে দিতে বাধ্য হয়।  

এরপর থেকেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বুঝতে শুরু করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামরিক জোট ব্যতীত কোনভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যাবেনা। ফলশ্রুতিতে ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. কার্ল মার্ক্সের ভবিষ্যৎদ্বানী এবং বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্র বিস্তারের প্রয়োজনে শুধু পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতেই না, বরং, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইন্দোচীনেও সোভিয়েতের একছত্র প্রভাব ছিলো। যার ফলে, ১৯৪৯ সালে চীনে বিপ্লব, ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধ, এবং পরবর্তীতে ইন্দোচীন সহ ল্যাটিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশেও সমাজতান্ত্রিক সশস্ত্র আন্দোলনের জন্ম হয়।  পশ্চিমা দেশগুলো এসকল কারণে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, এবং সিদ্ধান্ত নেয়, একটি সম্মিলিত সামরিক জোটের (Collective Security) মাধ্যমে প্রতিহত করার।

৩. ন্যাটো সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিলো পশ্চিমা জোটের প্রতিটি রাষ্ট্রকে একটি সামরিক জোটের ছায়াতলে নিয়ে আসা, একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকেও নিরাপত্তার খাতিরে পশ্চিমা জোটভুক্ত করে আরও শক্তিবৃদ্ধি করার মাধ্যমে সোভিয়েতের সামরিক সক্ষমতার বিপরীতে শক্তি ভারসাম্য তৈরি করা।

ন্যাটো প্রতিষ্ঠা

ন্যাটো প্রতিষ্ঠার একবছর আগে, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির ভবিষ্যৎ আক্রমন থেকে রক্ষার কথা ভেবে ১৯৪৮ সালে একটি যৌথ সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। অন্যদিকে একই বছরে ব্রাসেলসে লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, ও বেলজিয়াম সোভিয়েত আক্রমণের আশঙ্কা থেকে সামরিক জোটে জোটবদ্ধ হয়।

এ অবস্থায়, তৎকালীন কৌশলী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইউরোপের এই পাঁচটি দেশকে কূটনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ করতে সমর্থ হন। তিনি ঘোষনা দেন ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল পশ্চিম ইউরোপের বেশকিছু দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উত্তর আটলান্টিক সংস্থার চুক্তিতে সাক্ষর করে। এরই মাধ্যমে ন্যাটো আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রাষ্ট্র ছিলো ১২টি, সেগুলো হচ্ছে, কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গ, আইসল্যান্ড, ইতালি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে তুরস্ক ও গ্রিস ন্যাটোতে যোগদান করে।

ন্যাটোর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

ন্যাটোর সকল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মূল কারণ সংস্থাটির ৫ম আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ম আর্টিকেল মোতাবেকঃ

১. আন্তজার্তিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে, শান্তি নিশ্চিত করতে এবং যে কোন ধরনের নিরাপত্তার হুমকি রুখতে ন্যাটো সর্বদা জোটবদ্ধ ও অটল থাকবে। ন্যাটো কমাণ্ড মোতাবেক যে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে।

২. প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে একে অপরকে সাহায্য করা।

৩. আর্টিকেল ৫-এর এই ধারা মোতাবেক ন্যাটো জোটভুক্ত যে কোন একটি দেশ বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে, একে ন্যাটোর প্রতিটি রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করা হবে। এবং এর বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান (collective security) বা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যতদিন না নিরাপত্তা পরিষদ আক্রমণকারী বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। 

৪. ন্যাটোভুক্ত দেশ সমূহ নিয়মিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিরাপত্তা ও শান্তি বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট পেশ করবে এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদকে সহায়তা করবে।

৫. ন্যাটোতে নতুনভাবে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ন্যাটোর প্রতিটি সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন পড়বে।

ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম

নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিল কে বলা হয় ন্যাটোর সর্বোচ্চ কার্যকরী পরিষদ। এটিকে ন্যাটোর রাজনৈতিক পরিষদও বলা হয়ে থাকে। ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদের সদস্য হচ্ছেন প্রতিটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ। এই পরিষদের চেয়ারম্যান হচ্ছেন ন্যাটোর মহাসচিব। ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী ন্যাটোর মহাসচিব নির্বাচিত হন। তবে যে কোন প্রকার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই প্রত্যেক রাষ্ট্রের সর্বসম্মতির প্রয়োজন।

ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ কয়েকটি বিভাগ হচ্ছেঃ

১. প্রতিরক্ষা ও নীতিনির্ধারণী বিভাগ।

২. প্রতিরক্ষার সহায়তা বিভাগ।

৩. রাজনৈতিক বিভাগ।

৪. বিজ্ঞান বিষয়াবলীর বিভাগ।

ন্যাটোর সামরিক বিভাগ ফ্রান্স ব্যতীত বাকি সকল সদস্য রাষ্ট্রের সেনাপ্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত। বছরে দুবার এই বিভাগের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগটি প্রতিটি রাষ্ট্রের সেনা (পদাতিক), নৌ, বিমান বাহিনীর দ্বারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে এই সম্মিলিত সামরিক জোটের সর্বাধিনায়ক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন একজন মার্কিন অফিসার।

ন্যাটোর বাজেট প্রতিটি রাষ্ট্রের জিডিপির ২% এর দ্বারা গঠিত হবার কথা থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ন্যাটোর ব্যায়ের প্রায় ৫ ভাগের ৪ ভাগই বহন করে থাকে। এ নিয়ে, ২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভ ঘোষণা করে বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের জিডিপির ২% অংশ ন্যাটো বাজেটে না দিলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একা কাউকে রক্ষা করতে যাবেনা। যদিও, পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বদলের পর এ নিয়ে আর কোন ইস্যু তৈরি হয়নি।

২০২৩ সালের ডেটা অনুযায়ী, বর্তমানে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিয়োজিত আছেন সাবেক নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জেন্স স্টোল্টেনবার্গ।

ন্যাটোর স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ের কার্যক্রম

ন্যাটো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামরিক প্রতিরোধ তৈরি। কিন্তু অবাক হলেও সত্য, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পশ্চিমা জোট কখনই সরাসরি কোনো সংঘর্ষে জড়ায়নি কিংবা ন্যাটো মোতায়েন করার প্রয়োজন পড়েনি। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসে, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েকবার নিউক্লিয়ার যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও ১৯৮৩ সালের ন্যাটোর Able Archer 83  অপারেশন পৃথিবীকে নিউক্লিয়ার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে, সোভিয়েত লিডার জোসেফ স্টালিন ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে, ন্যাটোতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সম্পৃক্ত করার দাবী জানান। মার্কিনীরা এ অনুরোধ নাকচ করে দেয়। যার ফলে, পরবর্তী বছরই ন্যাটোর কাউন্টার স্ট্র‍্যাটেজি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ওয়ারশ প্যাক্ট

ন্যাটোর সদস্য বৃদ্ধি ও পূর্ব-ইউরোপে সম্প্রসারণ

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সোভিয়েত বনাম পশ্চিমা জোটের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রায়শই সামরিক আগ্রাসনে রূপ নিতো। তারমানে এই নয়, দুটি পরাশক্তি কখনো সামরিকভাবে একে অন্যের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অভিযানে গিয়েছে। বরং, বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপ, গোয়েন্দা (এসপিওনাজ) অপারেশনের মাধ্যমে কোন কিছু বানচাল করা, বিভিন্ন দেশে অস্ত্র এবং অর্থ রপ্তানির মাধ্যমে যুদ্ধে উস্কে দেয়া (প্রক্সি ওয়ার), এবং সরাসরি যুদ্ধে ভাড়াটে সেনা পাঠানোর মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখতো। ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর, সোভিয়েত ইউনিয়নও  ওয়ারশ প্যাক্ট প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণ স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই বেশ শক্ত ছিলো।

ন্যাটো ১৯৪৯ সালে ১২টি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে, ১৯৫২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি গ্রীস ও তুরস্ক এই জোটে যোগদান করে। মূলত তুরস্ক ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তাদের পূর্ব ইউরোপীয় স্যাটেলাইট স্টেটগুলোতে নিউক্লিয়ার বোমা হামলা করার ঘাঁটি। ১৯৫৫ সালের ৯ মে পশ্চিম জার্মানি, ও ১৯৮২ সালের ৩০ মে স্পেন ন্যাটোতে যোগদান করে।

১৯৯০ সালে একটি নেগোসিয়েশনে, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ "ন্যাটো আর পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ করবে না" এমন বিবৃতিতে ন্যাটোকে মৌখিকভাবে রাজি করান। একই সাথে, ওয়ারশ প্যাক্টও ভেঙে দেয়া হয়। পরবর্তী বছরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, কিন্তু ন্যাটো টিকে থাকে। যে সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের, কমিউনিজমের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করা; সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পরও- সেটির টিকে থাকা রাশিয়ানদের কাছে "বিশ্বাসঘাতকতা"র স্বরূপ।

শুধু তাই নয়, ১৯৯৯ সালে রাশিয়ান সীমান্ত সংলগ্ন রাষ্ট্র পোল্যান্ড সহ, হাঙ্গেরি, ও চেক প্রজাতন্ত্র যোগ দেয় ন্যাটোতে। ফলে ন্যাটো সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯-এ। ২০০৪ সালে ন্যাটো আবারও পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্র লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, বুলগেরিয়া, ও রোমানিয়া কে নতুন করে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে আলবেনিয়া ও ২০১৩ সালে ক্রোয়েশিয়া যোগদান করলে ন্যাটো সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ এ। পরবর্তীতে, ২০১৭ সালে মন্টেনেগ্রো, ও ২০২০ সালে মেসিডোনিয়া যোগদান করে।

স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে বিভিন্ন যুদ্ধ ও পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন অপারেশনে ব্যবহার করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় পূর্ব ইউরোপে বেশ কিছু নতুন রাষ্ট্রের সূচনা হয়, সদ্যস্বাধীন এই দেশগুলোর রাজনৈতিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটো ১৯৯৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মত অপারেশনে নামে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনা সংকটে ন্যাটোর বিমান হামলা ছিলো স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। পরবর্তীতে, ৯/১১ এর পর ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোর কার্যক্রম বেশ সমালোচিত হয়। ইরাকের আবু গারিব, আল-বুক্কা জেলখানা ও আফগানিস্তানের আল-বাগরাম জেলখানায় অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতনের অভিযোগ আছে ন্যাটোর ওপর।

কিন্তু ন্যাটোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিতর্কিত কার্যক্রম হচ্ছে পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে, রাশিয়ান সীমান্তে ন্যাটোর উপস্থিতি। রাশিয়া বেশ কয়েকবার ন্যাটোকে সতর্ক করার পরেও ন্যাটোর সম্প্রসারণ থেমে থাকেনি। ইতিমধ্যেই লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া সহ বেশ কিছু রাশিয়ান সীমান্তবর্তী দেশে ন্যাটো তার উপস্থিতির জানান দিয়েছে। যা সম্পূর্ণ ইউরোপে রাশিয়ার নিরাপত্তাকে ক্রমশ ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে বসে, যার ফলে নতুন করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট শুরু হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অনেকটাই পশ্চিমাপন্থী হওয়ায় তিনি বারবারই রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেশকিছু নীতি গ্রহণ করেন। এবং ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেন।

রাশিয়া এতে বাঁধা দেয়, এবং একই সাথে ইউক্রেনের ডনবাস ও লুহানক্স অঞ্চলে রাশিয়া ভাষাভাষী ইউক্রেনীয় নাগরিকদের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যা বন্ধে ইউক্রেনকে অনুরোধ জানান। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও সংকট নিরসন করতে না পেরে, ২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করে বসে, যা এখন পর্যন্ত চলমান আছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়ও বেশ কয়েকবার ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্তির আর্জি জানিয়ে এসেছেন, কিন্তু ন্যাটো বেশ ভালো করেই জানে- রাশিয়ার সাথে যুদ্ধরত একটি দেশকে বর্তমানে ন্যাটো সদস্যপদ দেয়া ন্যাটো সহ সমস্ত পশ্চিমা বিশ্বকে ঠিক কতটা ঝুঁকিতে ফেলবে। তবে ন্যাটো, এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে সর্বপ্রকার অস্ত্র, অর্থ এমনকি ভাড়াটে সেনা পাঠিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করছে। এটিও ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্যে একপ্রকার ঝুঁকি।   

যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়ই, পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্র ফিনল্যান্ড গত ৪ঠা এপ্রিল (২০২৩), ন্যাটোর ৩১তম সদস্য হিসেবে যোগদান করে, যা রাশিয়ার জন্য আরো বড়সড় একটি হুমকি। রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর এখন ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ফিনল্যান্ডের যোগদানের ফলে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সীমান্ত বেড়ে দাঁড়ালো দ্বিগুনে।

অন্যদিকে, সুইডেনও ন্যাটো সদস্য হওয়ার আবেদন করেছে, যা তুরস্কের বাঁধায় এখনও আটকে আছে। এছাড়াও, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বলে রাখা ভালো, রাশিয়া ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় পূর্ণমাত্রায় সামরিক আক্রমণ করে।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর ভূমিকা

"রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আকস্মিক কোন ঘটনা নয়, বরং ন্যাটোর ২০০৮ (বুখারেস্ট সামিট) সম্মেলন থেকেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাশিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্যক্ত করে আসছে। রাশিয়া তাঁর সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে কোনপ্রকার নিরাপত্তা বা অস্তিত্ব সংকট মেনে নেবে না। সম্ভবত, যুক্তরাষ্ট্র ভুলে যাচ্ছে, ন্যাটোতে পূর্ব-ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে সদস্য করতে গিয়ে একটি নিউক্লিয়ার ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে যুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। একই সাথে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে যতটা বা রাশিয়ার দায়, তারচেয়েও বেশি দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁর পশ্চিমা মিত্রজোটেরা।"

-       জন জ্যে মিয়ার্শাইমার (আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও প্রফেসর)

মিখাইল গর্বাচেভকে 'ন্যাটো আর পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ করবেনা' কথা দিলেও, ন্যাটো সে কথা রাখেনি। বসনিয়া, কসোভো থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় সংকটে ন্যাটো সবার আগে জড়িয়ে পড়েছে। ২০০৭ এর পর থেকে ন্যাটো ক্রমাগত রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শুধুমাত্র সদস্য রাষ্ট্র বৃদ্ধিই করছে না, বরং সেখানে ন্যাটো সেনা মোতায়েন সহ নানা ভাবে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। ন্যাটো বর্তমানে রাশিয়ার সাথে ২০০৭ সালের তুলনায় আড়াই গুন বেশি সীমান্ত অঞ্চল শেয়ার করছে, যা রাশিয়ান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না।

ইউক্রেনে ন্যাটোর উপস্থিতি রাশিয়ার নিরাপত্তাকে ব্যাপক হুমকির মুখে ফেলেছে। এমনকি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনও, "ন্যাটো যেভাবে রাশিয়া সীমান্তে অগ্রসর হচ্ছে, আমরা কি একই ভাবে এত অস্ত্রসস্ত্রসহ মার্কিন সীমান্তে গিয়েছি?"

ন্যাটো যে শুধুমাত্র সীমান্তে উপস্থিতিই বাড়াচ্ছে তাই না, ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটো অঢেল অর্থ সরবরাহ করছে, যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে। একই সাথে লাইট আর্মস থেকে আর্টিলারি ওয়েপন্স, এবং এন্টি এয়ারক্রাফট ওয়েপন্স সরবরাহ করে যুদ্ধের তীক্ষ্মতা বৃদ্ধি করছে।

শুধু তাই না, রাশিয়ান টাইমস (RT) এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ন্যাটো ইউক্রেন যুদ্ধে মার্সেনারি সরবরাহ করেও যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলেছে। ন্যাটোর এ বছরের সামিটের পর ইউক্রেনকে ট্যাংক, এন্টি মিসাইল সিস্টেম, লঙ রেঞ্জ মিসাইল, কমব্যাট ভেহিকল সহ নানা আধুনিক ভারী অস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। (তথ্যসূত্রঃ টাইমস ম্যাগাজিন)

ন্যাটোর কার্যক্রম কি প্রশ্নবিদ্ধ?

ন্যাটোকে যে কারণে সৃষ্টি করা হয়েছিলো, সেই কমিউনিজমের উদ্বেগ হারিয়ে গেছে বহু আগেই। বরং, ট্রান্স আটলান্টিক এই সংগঠন পশ্চিমাদের যুদ্ধংদেহী একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বসনিয়া যুদ্ধে ক্রমাগত বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা, কসোভো যুদ্ধে হস্তক্ষেপ থেকে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে ন্যাটোকে ব্যবহার, ন্যাটোর কার্যক্রমকে অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ন্যাটো আর আটলান্টিক অঞ্চলে আটকে নেই, ন্যাটো আর কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও নেই- ন্যাটো এখন পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষায় যে কোন যুদ্ধে, পৃথিবীর যে কোন ভৌগোলিক অবস্থানে যেতে রাজি। আরব বসন্তে, গনতন্ত্র রপ্তানির নামে লিবিয়ায় ন্যাটোর হস্তক্ষেপ লিবিয়ার সার্বিক পরিস্থিতিকে কেবল অস্থিতিশীলই করেনি, বরং সিরিয়ার মত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সংকটের তৈরি করেছে।  

অন্যদিকে, ন্যাটোর পূর্ব-ইউরোপীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণ রাশিয়াকে উস্কে দিচ্ছে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকটের দিকে। এ শুধুই সময়ের অপেক্ষা, ন্যাটোর এধরনের কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আরেকটি বৈশ্বিক সংকটের!

 

 

-       লেখকঃ

-       মুহাম্মদ ইরফান সাদিক,

   আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

       জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। 

No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.