Header Ads

Header ADS

Kenneth Waltz এর Neorealism Theory : সব ই সিস্টেমের দোষ!

Kenneth Waltz

Neorealism তত্ত্ব বিকাশে যাদের প্রভাব বেশি- কেনেথ ওয়ালজ (Kenneth Waltz) তন্মধ্যে অন্যতম। Theory of International Politics ওয়ালজের লেখা সর্বাধিক জনপ্রিয় বই। গ্রন্থে তিনি এক দুঃসাহসিক কাজ করার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ হওয়ায়, অর্থনৈতিক মডেলের ন্যায় কিছু মডেলের সাহায্যে ওয়ালজ আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতিগত বা বৈজ্ঞানিক রূপ দিতে চেয়েছেন। সেক্ষেত্রে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। 

প্রাথমিক ক্ষেত্রে ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজমের কিছু উপাদান গ্রহণ করলেও, ওয়ালজ তার Neorealism তত্ত্বে ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম তত্ত্বের অনেক ধারণাকে গ্রহণ করেন নি, বা গ্রহণ করলেও ভিন্ন ও স্বতন্ত্রভাবে ব্যাক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ওয়ালজ রাষ্ট্রের সমন্বয়ে নৈরাজ্যকর (Anarchic) আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে স্বীকার করলেও, ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম তত্ত্ব ও দর্শনের মানব চরিত্র, রাষ্ট্র পরিচালকের বিচক্ষণতা, জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ প্রভৃতি ওয়ালজের নব্য-বাস্তবাদ (Neorealism)  তত্ত্বে জায়গা পায়নি।    


ভিন্ন স্বার্থ ও বৈদেশিক নীতিঃ

যদি এভাবে বলি, ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম যেখানে আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যকর ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্বার্থ আদায়ে প্রণীত বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বৈচিত্র খুঁজে পায়, অর্থাৎ, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের ভাষায়, রাষ্ট্র-করাষ্ট্র-খ এর জাতীয় স্বার্থ স্বাভাবিকভাবে এক নয়, এবং সেই স্বার্থ আদায়ের প্রণীত বৈদেশিক নীতিও রাষ্ট্র-ক এর থেকে রাষ্ট্র-খ এর ভিন্ন হয়।   

যদি উদাহরণ দিয়ে বলি, ক্লাসিক্যাল রিয়েলিস্ট তত্ত্বমতে, বাংলাদেশ ভারত দুটি প্রতিবেশী দেশ হলেও, দুটি দেশের স্বার্থ একে অন্যের থেকে ভিন্ন। হয়তো বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মানকে নিজের স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করে, এবং সেই স্বার্থ আদায়ে বাংলাদেশ তার বৈদেশিক নীতিতে চীন/জাপান/যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে ভিন্ন হবে, এবং বঙ্গোপসাগরে ভারত ছাড়া অন্য বৃহৎ শক্তির অনুপ্রবেশকে ভারত তার বৈদেশিক নীতি অনুযায়ী হুমকি হিসেবে নিবে।    

বিপরীতে, ওয়ালজের নব্য-বাস্তববাদ তত্ত্বমতে, রাষ্ট্রের স্বার্থ ও বৈদেশিক নীতি কখনো রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয় না, বরং আন্তর্জাতিক সিস্টেম বা ব্যবস্থার প্রচ্ছন্ন প্রভাবে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারিত হয়। এছাড়াও, রাষ্ট্রের পারস্পারিক আচারণ, সম্পর্ক পরিচালনার গতিপথ, ও রাষ্ট্র প্রধানের রাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণই আন্তর্জাতিক সিস্টেম ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে তার বৈদেশিক নীতি বা আচারণ নির্ধারণ করতে পারে না, সিস্টেমই তাকে বলে দেয় কিভাবে রাষ্ট্র তার আচারণ করবে বা সম্পর্ক পরিচালনা করবে। 

যেমন: স্নায়ুযুদ্ধকালের দ্বিমেরু (Bipolar) বিশ্ব ব্যবস্থাকে যদি ধরি, সোভিয়েত ইউনিয়ন যে আন্তর্জাতিক সিস্টেম গঠন করেছিলো তার সদস্য দেশগুলোর বৈদেশিক নীতি বা স্বার্থ ছিলো পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধীতা করা। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিজমকে পুঁজিবাদের বিপরীতে ওয়ার্ল্ড অর্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিলো। ফলে, এই সিস্টেমের দেশগুলোর স্বার্থ সব সময় পশ্চিমা বিরোধী মতাদর্শে পরিচালিত হত, এবং সোভিয়েত সিস্টেমের দেশগুলোর বৈদেশিক নীতিও একই মতাদর্শের ভিত্তিতে গৃহীত হত।  

ঠিক এর বিপরীতটা হত পুঁজিবাদী পশ্চিমা সিস্টেমে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী পশ্চিমা সিস্টেমের স্বার্থ ছিলো কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করা, এবং এই রোধ কল্পে, সিস্টেম যে নীতি বা পদক্ষেপের কথা বলত, পশ্চিমা সিস্টেমের রাষ্ট্রগুলো সেগুলোকে বৈদেশিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করতো।  যেমনঃ ন্যাটো গঠন, উদারবাদী গণতন্ত্রের বিকাশ, মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রভৃতি।  

 
স্বার্বভৌমত্ব ও সক্ষমতাঃ  

ওয়ালজের নব্য-বাস্তববাদ তত্ত্বমতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্র কিছু কাজ প্রথাগতভাবে করে যায়। যেমনঃ রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক নীতি পরিচালন ইত্যাদি। এই কাজগুলোর বিবেচনায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রই সমান, অর্থাৎ, সব দেশই এই কাজগুলো করে থাকে। 

তবে, রাষ্ট্রের সক্ষমতার (সামরিক ও অর্থনৈতিক) বিচারে সিস্টেমে অসমতা দেখা যায়। অর্থাৎ, অন্যান্য দিকে সমান থাকা সত্বেও রাষ্ট্র-করাষ্ট্র-খ সামরিক সক্ষমতার বিচারে একে অন্যের থেকে আলাদা। ওয়ালজের ভাষায়, রাষ্ট্রের সমন্বয়ে যেহেতু সিস্টেম তৈরি হয়, সেহেতু দুর্বল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, সিস্টেমে যত বেশি শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকবে, সিস্টেমটি তত শক্তিশালী ও কার্যকার হবে। অন্যথায় সিস্টেমটি দুর্বল হবে।  

উদাহরণ হিসেবে নেপাল ও ভারতের কথা বলা যায়। নেপাল ও ভারত উভয়েই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ফলে তারা নিজেদের দেশের রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালন ইত্যাদি প্রথাগতভাবেই সম্পাদন করে। কিন্তু সার্বভৌম হলেও, সিস্টেমে এই দুটি দেশের অবস্থান ভিন্ন। অর্থাৎ, সামরিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় নেপালের তুলনায় ভারত অনেক এগিয়ে, অর্থাৎ ভারতের সক্ষমতা বেশি। তাই, ভারত দক্ষিন এশিয়ার সিস্টেমকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে, চীন ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের তুলনায় চীনের সক্ষমতা বেশী।  ফলে, চীন ও ভিয়েতনামকে নিয়ে যে সিস্টেমটি হবে, সেখানে বৃহৎ শক্তি হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চীন প্রভাবিত করে।

এবাদে যদি কার্যকারিতার কথা বলি, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সিস্টেমের কথা বলি, এই সিস্টেমের দেশগুলো যেমনঃ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইইউ, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিক শক্তিশালী হওয়ায়, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিকে দমিয়ে রেখে উদারবাদী ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করছে। সেক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া, ইরানকে নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন আন্তর্জাতিক সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ত্বাধীন ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে পরিবর্তন করতে পারছে না। 


সিস্টেমে পরিবর্তন কে আনবেঃ 

ওয়ালজের ভাষায়, বৃহৎ শক্তির উত্থান বা পতন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় সূচনা করে। অর্থাৎ, সিস্টেমে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির সামরিকভাবে পতন বা উত্থান, সিস্টেমকে নতুনভাবে রূপ দেয়। বড় কোন যুদ্ধ বা সংঘাত বা অর্থনৈতিক মন্দা বা আদর্শের পরিবর্তনের মাধ্যমে সিস্টেমে নতুনত্ব আসে। যেমনঃ ১৮৭০ সালে যখন দুই জার্মানি একত্রিত হয়, তখন ইউরোপীয় সিস্টেমে বৃটেন ও ফ্রান্সকে চ্যালেঞ্জ করার মত আরেকটি শক্তি বা সিস্টেমের সূচনা হয়। এই সিস্টেমে জার্মান, অস্ট্রো-হাংগেরী ও অটোমান সাম্রাজ্য ছিলো। 

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঘাতে জার্মানদের সিস্টেমটির পতন হয়, এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন রূপ আসে। একই ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যে সিস্টেম তৈরি করেছিলো, যুদ্ধের পরে আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বর্তমানে চীনের উত্থানকেও আমেরিকা নেতৃত্ত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হয়, এবং ভবিষ্যতে যদি চীন কোন প্রেক্ষাপটে আমেরিকার থেকে সক্ষমতায় বেশি এগিয়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক সিস্টেমে আবারও রূপান্তর ঘটবে, এবং চীন হবে সেই সিস্টেমের রূপকার।


দ্বি-মেরু বনাম বহুমেরু ওয়ার্ল্ড সিস্টেমঃ   

ওয়ালজের ভাষায় প্রতিটি সিস্টেম রাজনৈতিক মেরুকরণ (Polarity) তৈরি করে। প্রেক্ষাপট অনুসারে রাষ্ট্রের সক্ষমতায় যে পরিবর্তন আসে তা যেমন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ (Unipolarity, Bipolarity, Multipolarity) তৈরি করে।  যেমনঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মান, অটোমান, জার্মান প্রভৃতি শক্তিদের নিয়ে বহুমেরুর (Multipolar) আন্তর্জাতিক সিস্টেম তৈরি হয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে দ্বিমেরু (Bipolar) বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়; স্নায়ুযুদ্ধ শেষে আমেরিকা যখন একমাত্র বৃহৎ শক্তি তখন আন্তর্জাতিক সিস্টেম ছিলো একমেরুর (Unipolar); এবং বর্তমানে চীন, রাশিয়া, ভারত, তুরস্কের মত শক্তির আবির্ভাব আন্তর্জাতিক সিস্টেমকে আবারও বহুমেরুর (Multipolar) দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 
 
ওয়ালজের ভাষায় যে মেরুকরণ আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য ব্যবস্থায় যত বেশি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সে মেরুকরণ তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সে বিবেচনায় ওয়ালজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একমেরু ও বহুমেরুর তুলনায়, দ্বি-মেরুকে বেশি টেঁকসই ও আবশ্যক বলেছেন। ওয়ালজের বিবেচনায় স্নায়ুযুদ্ধ- ১৯৯০ পরবর্তী ও ১৯৪৫ পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ ছিলো। 

অর্থাৎ, বহুমেরু সিস্টেমের ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে। কারণ বহুমেরু সিস্টেমে প্রতিটি সিস্টেমের আলাদা স্বার্থ থাকে, এবং কোন ক্রাইসিস মুহূর্তে বৃহৎ শক্তিগুলো দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসে না। একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায়, একটা বৃহৎ রাষ্ট্র ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সিস্টেমে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ থাকে না। ফলে সিস্টেমের অন্যান্য দেশগুলো, বৃহৎ শক্তির নীতি মেনে চলে। যেমনঃ প্রথম গালফ যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ প্রভৃতি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একমেরুর বিশ্বব্যবস্থার নিষ্ঠুরতম উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থে অন্যান্য দেশগুলোকেও এই যুদ্ধকে সমর্থন দিতে হয়। ফলে বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় থাকে না। 

তবে দ্বিমেরু বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সিস্টেমে দুটি বৃহৎ শক্তি সিস্টেমকে প্রভাবিত করতে চায়। একধরণের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবসময় বজায় থাকে। ফলে, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জন সহজ হয়। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে দুটি বৃহৎ শক্তির প্রভাব লক্ষিত হয়। এক পক্ষ স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকলে, অন্য পক্ষ সহযোগিতা করে। ফলে শক্তিসাম্য বজায় থাকে। 


রাজা নয়, সিস্টেমই আসল কর্তাঃ 

ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজমে রাষ্ট্র পরিচালকের বিচক্ষণতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। ম্যাকেয়াভেলির দ্যা প্রিন্স গ্রন্থের সাহসী ও চতুর রাজার আবশ্যিকতাকে ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম গ্রহণ করে। মরগেন্থুর ভাষায়, রাজা/শাসককে যৌক্তিক হতে হয়, অর্থাৎ, সার্বজনীন মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত আদর্শের বাহিরে গিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থে দরকারে স্বতন্ত্র বৈদেশিক নীতি, সামরিক সংঘাতে জড়ানো, ও কুটনৈতিক কূটকৌশলে পারদর্শী হতে হয়।  

তবে ওয়ালজের নব্য-বাস্তববাদ তত্ত্বে, রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, শাসকের বিচক্ষণতা বা কূটনীতি প্রভৃতির তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, বরং ওয়ালজ বলেন, সিস্টেমই নির্ধারণ করে দিবে কিভাবে, কখন কোন পলিসি একটি রাষ্ট্র বা শাসক গ্রহণ করবে।  


সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাঃ 

ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম ও ওয়ালজের নব্য-বাস্তবাববাদ বা নিও-রিয়েলিজম আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান চরিত্র রাষ্ট্রকে সার্বভৌম হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে ক্লাসিক্যাল বাস্তববাদ যেখানে এই সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের নীতি গ্রহণ ও প্রণয়ন, নিরাপত্তা অর্জন প্রভৃতির বিবেচনায় ব্যাক্ষা করে, নব্য-বাস্তববাদ সেখানে সার্বভৌমত্বকে পক্ষ গ্রহণের স্বাধীনতা হিসেবে দেখে। 

অর্থাৎ, সিস্টেমের প্রভাব রাষ্ট্রের নীতির উপর যখন পড়ে, তখন রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্বের জোড়ে সে কোন সিস্টেমের অংশ হবে বা হবে না তা বিবেচনা করতে পারে। এবাদেও রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পরস্পর সমান- একে অন্যের হুকুম মেনে চলবে না, অন্যের প্রতি অনুগত হবে না, এবং ওয়ালজ কোন দার্শনিক ভিত্তি না টেনে রাষ্ট্রের এই সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকে চিরায়ত ধরে তার সিস্টেম তত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছেন। 


জাতীয় স্বার্থ একটি সিগনালের মতঃ

ওয়ালজের নব্য-বাস্তবাদ তত্ত্বে জাতীয় স্বার্থের বিষয়কে ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম থেকে ভিন্ন করে ব্যাক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম বা বাস্তববাদে জাতীয় স্বার্থকে একটা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার প্রধান ও একক উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি রাষ্ট্র সেই স্বার্থ আদায়ে এমন এক বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করবে যেখানে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কূটনৈতিক কৌশল উভয়েই থাকবে। 

তবে ওয়ালজের neorealism তত্ত্বমতে, জাতীয় স্বার্থ একটি সিগন্যালের মত যা সয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের সামনে উপস্থিত হয়, এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সেই সিগন্যালকে সাড়া দিতে সিস্টেমের নীতি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে সিস্টেম যেভাবে সমাধান দিবে, বা যে উপায় অবলম্বনের কথা বলবে, সিস্টেমের অংশ হিসেবে রাষ্ট্র সেগুলোকে মেনে নিবে। 


বৃহৎ শক্তি ও সিস্টেমঃ 

ওয়ালজের ভাষায়, আন্তর্জাতিক সিস্টেম যে রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত সেখানে শক্তি ও সক্ষমতায় বৃহৎ রাষ্ট্রটি সিস্টেমে অর্ডার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এই অর্ডার সামগ্রিক ওয়ার্ল্ড অর্ডারের একটা খন্ডিত রূপ। তিনি বলেন, বৃহৎ শক্তি যে সিস্টেমে দায়িত্বশীল হবে তাই-ই নয়, তাকে সিস্টেমের সকল রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। ওয়ালজের ভাষায় ওয়ার্ল্ড অর্ডার বহুমেরু সিস্টেম থেকে দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থায় বেশি কার্যকারী হয়ে ওঠে।  

যেমনঃ সাম্প্রতিক ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংঘাতের কথা যদি বলি, সিস্টেমে যে এই ক্রাইসিসটা দীর্ঘদিন বজায় আছে, তার অন্যতম কারণ বৃহৎ শক্তি যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এই সঙ্কট সমাধানে অনীহা। তবে যদি কোরিয়া যুদ্ধের কথা বলি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি শান্তিপূর্ণ সীমানা লাইন কিন্তু দুই কোরিয়ার মাঝে টেনে দেয়া হয়েছে। নাগার্নো কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সে সংঘাত, সেক্ষেত্রে রাশিয়া বৃহৎ শক্তি হিসেবে মধ্যস্থতার কাজ করে। অর্থাৎ, বৃহৎ শক্তি সিস্টেমকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

অতএব, ওয়ালজের নিও-রিয়েলিজম তত্ত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি, রাষ্ট্রের আচারণ বা স্বার্থ নির্ধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সিস্টেম দ্বারা প্রভাবিত হবে। প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রের পারস্পারিক মিলনে এই সিস্টেম গঠিত হলেও, পরবর্তীতে রাষ্ট্রের আচারণকে প্রভাবিত করে চলে আন্তর্জাতিক সিস্টেম। কেনেথ ওয়ালজের নব্য-বাস্তবাদ তত্ত্বে সেই সিস্টেমকেই ব্যাক্ষা করা চেষ্টা করা হয়েছে। 


To be continued......


লেখকঃ 
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
03bodir@gmail.com








  



















No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.