Header Ads

Header ADS

আফ্রিকান ইউনিয়নঃ বাঁধা পেড়িয়ে সম্ভাবনার পথে

 


আফ্রিকান ইউনিয়ন কী? 

আফ্রিকান ইউনিয়ন আফ্রিকা মহাদেশের ৫৫টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক সংগঠন। সংগঠনটির সদর দপ্তর ইথিয়পীয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা'য় অবস্থিত। আফ্রিকান ইউনিয়ন আফ্রিকার প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, গনতন্ত্র ও মানবাধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ইত্যাদি নিয়ে- সম্পূর্ণ আফ্রিকা মহাদেশ অর্থাৎ ৩০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটারে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আফ্রিকান ইউনিয়ন এই বৃহৎ মহাদেশের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে।

বর্তমানে, এর সদস্য সংখ্যা ৫৫টি দেশ হলেও মিলিটারি ক্যু এর কারণে বুর্কিনা ফাসো, গিনি, মালি ও সুদানকে সংগঠন থেকে বহিস্কৃত করা হয়েছে।

১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর লিবিয়ায় তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমন্ত্রণে Organisation of African Unity  এর সদস্যদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। লিবিয়ায় সার্তে শহরে অনুষ্ঠিত এই সভায় African Union প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পেশ করা হয়, যা Sirte Declaration হিসেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে আফ্রিকান দেশগুলোর একটি একক শক্তিশালী জোট (AU) প্রতিষ্ঠা লাভ করে।


আফ্রিকান ইউনিয়নের সুচনা ও কার্যক্রম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। সদ্যস্বাধীন দেশগুলোর মধ্যকার একতা, সহযোগিতা, ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে মিশরের কায়রো তে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় "আফ্রিকান ইউনিটি" (OAU) কিন্তু পারস্পরিক কোন্দল, ব্যর্থতা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস ইত্যাদি কারণে OAU সংগঠন হিসেবে খুব সামান্যই সাফল্যের মুখ দেখে। পরবর্তীতে, ১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, লিবিয়ায় সার্তে শহরে একটি সাধারণ সভায় আফ্রিকান ইউনিয়ন নতুন সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পেশ করা হয়।

২০০২ সালের জুলাই মাসে আফ্রিকান ইউনিয়ন ৫১টি দেশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের ১১তম আর্টিকেল অনুযায়ী মোট দাপ্তরিক ভাষা ৬টি। আরবি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও সোয়াহিলি।

ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ন্যায় আফ্রিকান ইউনিয়নেরও "Pan-African Parliament" রয়েছে। যদিও আফ্রিকান পার্লামেন্ট কোনপ্রকার আইন প্রণয়ন বা পাশ করে না বরং এটি কেবল দাবী উত্থাপন ও আলোচনা করে থাকে। আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটের মাধ্যমে ২৬৫ জন সদস্যের এই পার্লামেন্ট তৈরি হয়।

আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যানশীপ মাত্র এক বছরের জন্য নির্বাচন করা হয়, যা আফ্রিকার প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। কমরোসের সাবেক রাষ্ট্রপতি আজালি আসোমানি বর্তমানে আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন (২০২৩)

আফ্রিকান ইউনিয়নের ডিসিশন মেকিং বডি হচ্ছে এসেম্বলি। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অথবা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই এসেম্বলি গঠিত। প্রতিবছর অন্তত একবার প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এসেম্বলিতে সংগঠিত হন। এই এসেম্বলির কাজ হচ্ছে পার্লামেন্টে আলোচিত বিভিন্ন বিষয় থেকে যাচাই-বাছাই করে নির্বাচিত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা।

আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করতে আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন ও আফ্রিকান ইউনিয়নের এক্সিকিউটিভ বডি সহায়তা করে থাকে। যা প্রতিটি দেশের মন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত।

অন্যদিকে, দ্যা পিস এন্ড সিকিউরিটি কাউন্সিল আফ্রিকার যে কোন ধরনের সামরিক সংকট, সংঘাত, গনহত্যা, যুদ্ধ ও জরুরি পরিস্থিতিতে ডিসিশন মেকিং বডি (কনফ্লিক্ট) হিসেবে কাজ করে।

Force africaine en attente / The African Standby Force (ASF)  আফ্রিকান ইউনিয়নের সামরিক শাখা বা নিজস্ব সেনাবাহিনী। আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রয়োজন অনুসারে, বিভিন্ন সামরিক সংকট মোকাবেলায় ASF এর সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ আফ্রিকার যে কোন দেশে মোতায়েন করতে পারে। যেমনঃ দক্ষিণ সুদানের সংকটে ২০১৬ সালে জাতিসংঘের পাশাপাশি আফ্রিকান ইউনিয়নের সেনারাও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়।

এগুলো ছাড়াও আফ্রিকান ইউনিয়নের আলাদা ১০টি বিশেষায়িত কমিটি রয়েছে। এদের প্রত্যেকেই আফ্রিকান ইউনিয়নের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে থাকে।

আফ্রিকান ইউনিয়ন এখনও খুব বেশি কিছু সাফল্যের মুখ দেখেনি, যেমন একক পাসপোর্ট নীতি, একক মুদ্রা ইত্যাদি এখনও চালু করতে পারেনি। তবে গনতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আফ্রিকান ইউনিয়ন বেশ সাফল্যের সাথে কাজ করছে।


সাফল্য ও সম্ভাবনা

আফ্রিকান ইউনিয়ন একটি বৃহৎ সংগঠন যা সম্পূর্ণ আফ্রিকা মহাদেশের নানাবিধ সমস্যা, সংকট, বাণিজ্য, সহযোগিতা ও একতা রক্ষায় কাজ করে। সংগঠনটির বেশকিছু সাফল্য রয়েছে যেমনঃ

গণতন্ত্র রক্ষায়ঃ আফ্রিকান ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় সাফল্যের ক্ষেত্রটি গণতন্ত্র রক্ষা করা। আফ্রিকা মহাদেশে গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এমনকি সামরিক অভিযানও আফ্রিকান ইউনিয়ন পরিচালনা করে আসছে। বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র যেমনঃ মালি, গিনি, গিনি-বিসাউ, কঙ্গো, সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুর্কিনা ফাসো ইত্যাদি দেশে ইতিপূর্বে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও সামরিক ক্যু এর কারণে সংগঠনটি দেশগুলোকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে।

কঙ্গোতে ২০০৭ সালের নির্বাচনের পর দেশব্যাপী সহিংসতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ায় আফ্রিকান ইউনিয়নের উদ্যোগে একটি কোয়ালিশন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সংঘাত দমনে আফ্রিকান ইউনিয়নের এটি একটি বড় সাফল্য। এছাড়াও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, কমোরোস ও সোমালিয়াতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সরব উপস্থিতি সংঘাত দমনে বড় ভূমিকা রাখছে।

(বলে রাখা ভালো, আফ্রিকান ইউনিয়ন সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সোমালিল্যান্ড কে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করেনি। অন্যদিকে, পশ্চিম আফ্রিকার বিবাদমান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সারাওয়ি আরব ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য। যার ফলে মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে পড়ে, এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে পুনরায় যোগদান করে।)


কূটনৈতিক সাফল্যঃ

আফ্রিকান ইউনিয়ন বেশ সফলতার সাথে কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করে আসছে। ২০২২ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের কূটনৈতিক সহায়তায় দক্ষিণ আফ্রিকায়, ইথিওপিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট ও ইথিওপিয়ান সরকারের মধ্যকার একটি শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়। যার ফলে দেশটি গৃহযুদ্ধের কবল থেকে রক্ষা পায়।

এছাড়াও ম্যালেরিয়া, কলেরা, ইবোলা ভাইরাস ও এইডস প্রতিরোধে আফ্রিকান ইউনিয়নের সাফল্য প্রশংসনীয়। গত ৩ বছরে সংগঠনটি প্রায় ১ বিলিয়ন ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে।


সম্ভাবনাঃ আফ্রিকান মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল

২০১৮ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের উদ্যোগে ৫৩টি দেশ নিয়ে আফ্রিকান মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের প্রস্তাব করা হয়। এতে করে দেশগুলোর মধ্যকার শুল্কমুক্ত বাণিজ্যে সৃষ্টি হবে। ভৌগোলিক আয়তন কিংবা জনসংখ্যার ভিত্তিতে এটিই হবে পৃথিবীর বৃহত্তম বাণিজ্যিক মুক্তাঞ্চল।

বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, এই বাণিজ্যিক মুক্তাঞ্চলের ফলে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্রসীমা থেকে মুক্তি পাবে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে এরই উদ্যোগে সমগ্র আফ্রিকায় নিজস্ব মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা Pan-African payment and settlement system (PAPPS)  নামে পরিচিত।

 

ব্যর্থতা

আফ্রিকান ইউনিয়নের সফলতা পাশাপাশি বেশকিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। নীলনদের ওপর ইথিওপিয়ার বাঁধ নির্মানকে কেন্দ্র করে ইথিওপিয়া ও মিশরের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সমস্যায় আফ্রিকান ইউনিয়ন তেমন কিছুই করতে পারেনি। ইথিওপিয়ায় বেশকিছু গুপ্তহত্যা ও মিশরের পক্ষ থেকে যুদ্ধের উস্কানি আসলেও আফ্রিকান ইউনিয়ন নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে আল-শাবাব, আল-কায়েদার মতন সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, নাইজেরিয়ায় কিডন্যাপিং ইত্যাদি ইস্যুতে আফ্রিকান ইউনিয়নের কার্যক্রম সংগঠনের কার্যক্ষমতা কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।




লেখকঃ 

মুহাম্মদ ইরফান সাদিক,

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.