আনন্দের ও সৌন্দর্যের বশবর্তী হয়ে আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যায়ণ করি
না, কারণ বিশ্বরাজনীতির দুনিয়া সুন্দর
নয়। অনেকক্ষেত্রে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে
বিশ্বরাজনীতির পূর্ণ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। পক্ষান্তরে, বিবিধ মান-নির্ণায়ক প্রশ্নের (Normative
Questions) সহযোগে আমরা বিশ্বরাজনীতির নানা অনুষঙ্গ যেমন: সংঘাত, সংকট ও যুদ্ধের কারণ অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা চালাই। এ প্রচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য কোন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা বা বয়ান তৈরি করা
যার নিমিত্তে বিশ্বরাজনীতির একক- রাষ্ট্র ও অন্যান্য কর্মকরা (Actors) কোন ধ্বংসাত্মক কাজে অবতীর্ণ
হওয়ার বদলে সমন্বিতভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য অর্জন করবে।
বিশ্বরাজনীতি বিশ্লেষণের এই যে ইতিবাচক প্রয়াস তা ক্রমে আন্তর্জাতিক পরিক্রমায়
নতুন নতুন জ্ঞানের ক্ষেত্র উন্মোচিত করেছে। যেমন: ১৯৩০-এর মহামন্দার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক
রাজনীতির অর্থনীতি (International Political Economy- IPE), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় নিরাপত্তা অধ্যায়ণ
(Security Studies), স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে সংঘাত
ও শান্তি অধ্যায়ণ ( Conflict and Peace Studies) প্রভৃতি জ্ঞানের
শাখা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুধাবনে বৈচিত্র্য এনেছে।
বিশ্ব রাজনীতির শিক্ষার্থীদের একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে: আন্তর্জাতিক
পরিক্রমায় চলমান, বিশেষত সাম্প্রতিক ঘটনাবলীকে (কার্যকারণ ও ফলাফলসহ) জন-সাধারণের সামনে বিশ্লেষণী আকারে তুলে ধরা। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আবশ্যক নয় যে তারা সরকার বা রাষ্ট্রের প্রণীত
নীতির বিশ্লেষণে সরকারি বয়ানকে অনুসরণ করবে। বরং শিক্ষার্থীদের প্রধান কাজ হবে বিশ্ব রাজনীতির চলমান ঘটনাবলীর গভীরে
প্রবেশ করা, এবং বিশ্লেষণে প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে আনা,
যদিও/ যতই তা রাষ্ট্রের বা সরকারের বয়ানকে
চ্যালেঞ্জও করে।
বিশ্ব রাজনীতির পাঠ শুরু-ই হয় যুদ্ধের পাঠ দিয়ে: আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় যুদ্ধ কেন নৈমিত্তিক এবং কোন কোন অনুষঙ্গে
যুদ্ধের সম্ভাবনা বেড়ে যায়? (Why is war a perennial institution of
international society and what variable factors affect its incidence?) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রিয়েলিজম তত্ত্ব উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার
চেষ্টা করে। রিয়েলিস্টদের ভাষায়, রাষ্ট্র তার সকল কার্য যুক্তির (rational) অনুবর্তী হয়ে সম্পাদন করে। এই যৌক্তিকতাই রাষ্ট্রকে শক্তির সমীকরণ গ্রহণে উদ্ভুদ্ধ করে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের স্বার্থ লাভে শক্তি বৃদ্ধিই রাষ্ট্রের প্রধান
কাজ বা লক্ষ্য (মরগেন্থু, ১৯৬৭)। তবে, রাষ্ট্র যদি একটি যুক্তি অনুবর্তী কর্মক
হয়, তাহলে কোন বিচারে বা যুক্তিতে রাষ্ট্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়
যা ঐ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক বিকাশেকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে? তা সাধারণ পাঠকদের নিকট দীর্ঘদিন অস্পষ্ট
থেকেছে। থমাস স্কেলিং-এর মত সাম্প্রতিক সময়ের
কিছু তাত্ত্বিক তথ্য ও তার গ্রহণযোগ্যতা, এবং যুদ্ধকে ঘিরে গড়ে
ওঠা রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান ও সামরিক স্থাপনার জটিল সম্পর্ককে (Military
Industrial Complex) রাষ্ট্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ
করেন। তবে, পাঠকদের
চাহিদা স্কেলিং- এর ব্যাক্ষা ততটা পূরণ করতে পারেনি।
রবার্ট কোহেনের ভাষায় যুদ্ধ অনেকাংশে বিরোধিতা (Discord) ও সহযোগিতা
(Cooperation) কে ঘিরে আবর্তিত হয়। যদি গত পঞ্চাশ বছরের কথা বলা হয়, এই সময়ে
সহযোগিতার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে নয়, বরংঞ্চ বিরোধিতার প্রেক্ষাপট থেকে। পরবর্তীতে, বিরোধিতার উপাদান প্রশমিত করতে
ও বহুপাক্ষিক স্বার্থ হেফাজতকরণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক
সংস্থা ও আইনি কাঠামোর আগমন ঘটে যা বিরোধিতার বিপরীতে সহযোগিতাকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য
করে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনায় পারস্পরিক সুবিধা দান নীতির অনুসরণ (Reciprocity)
খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, রাষ্ট্রের আচরণের এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি যেমন পারস্পরিক
বিরোধিতা তৈরি করতে পারে, বিপরীতে, সহযোগিতার
ক্ষেত্রকেও প্রসারিত করতে পারে।
তবে, এই সহযোগিতা ও বিরোধিতা উভয়েই আমাদের আরও এক
জটিল বিতর্কে ঠেলে দেয়, আর তাহল: সার্বভৌমত্বের
(Sovereignty) ধরন কেমন হবে?
সহযোগিতার কথা যখন আসে তখন কোন প্রেক্ষিতে সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রশমিত
হবে? কোন প্রেক্ষিতে একটি রাষ্ট্র তার অধীনের কোন সমাজ/
সম্প্রদায়ের উপর নিষ্পেষণ চালাতে পারেব? বা গৃহযুদ্ধ
প্রতিরোধে কী সামরিক অভিযান চালাতে পারবে? অধ্যাপক ক্রাসনার তার
লেখনীতে সার্বভৌমত্ব ধারণাকে বিস্তারিত আকারে
আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি গৃহযুদ্ধ ও হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে
সার্বভৌমত্বকে প্রশমনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে, রবার্ট ও কোহেনের ভাষায়, এই যাবতীয় বিষয়গুলোর পিছনে লুক্কায়িত অবস্থায় আছে পাওয়ার বা শক্তির ধারণা। তিনি মনে করেন প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব শুধু যুদ্ধ বা হুমকিতেই
সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এই সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতির
মাঝে এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়। যেমন রাজনীতির অর্থনীতি
অধ্যায়ণে বলা হয়, “কিভাবে সম্পদ পাওয়া যায় ও কিভাবে শক্তিশালী হওয়া যায় এই সমীকরণের আবর্তেই আন্তর্জাতিক
সম্পর্কের একক অর্থাৎ রাষ্ট্রের পারস্পরিক আচার-আচরণ নির্ধারিত হয়। (the reciprocal and dynamic interaction in international relations of the
pursuit of wealth and the pursuit of power) (Gilpin, 1975)”।
সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রাকৃতিক সম্পদ কিভাবে শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়
সে উত্তর খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে, শিক্ষার্থীরা জোসেফ নাই'য়ের Soft
Power সম্পর্কে অধ্যায়ণ করতে পারে। জোসেফ নাই'য়ের সফট পাওয়ারে তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।কারণ এই তথ্যই মানুষের বিশ্বাস, পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টি, বিশ্বরাজনীতির বয়ান ইত্যাদিকে তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে, তথ্যই এক রাষ্টকে অন্য রাষ্ট্রের আচারণের
উপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এই তথ্যই পাঠকের মাঝে চেতনা তৈরি করে অমুক রাষ্ট্র প্রাকৃতিক সম্পদের
সাহায্যে শক্তিশালী হতে পারবে, বা অমুক রাষ্ট্র পারবে না। এই তথ্য যে সত্য বা সঠিক তা নয়, বরং এই তথ্য
সম্পদ ও শক্তি অর্জনের পক্ষে কীভাবে বয়ান তৈরি করে শক্তিশালীর রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়
করতে পারে তা শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, এবং সে বিবেচনায় আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিশ্লেষণে তথ্যের সুত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রবার্ট ও কোহেন বলেন, এভাবেই যুদ্ধের সাথে সহযোগিতা ও
শক্তির সাথে স্বার্থের প্রশ্ন বা সম্পর্ক বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠে। কিভাবে যুদ্ধ বা সংঘাতময় পরিস্থিতির বিপরীতে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান
প্রতিষ্ঠা করা যায় তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের বিশ্লেষণে ফুটে উঠে। ফলে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়, এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তুলনায় বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ
ও সংঘাতের প্রবণতা কমতে শুরু করে। তবে,
শিক্ষার্থীদের প্রতি কোহেন সুপারিশ, শিক্ষার্থীরা
তাদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যেন অনুমান নির্ভর না হয়, এবং তারা
যে তথ্যকে গ্রহণ করছে তার উৎসকে পরীক্ষা করে নেয়। কারণ এই তথ্যগুলোর অধিকাংশ কোন বৈজ্ঞানিক বা পদ্ধতিগত দিক অনুসরণ
করে লেখা হয়নি।
বিশ্ব রাজনীতির ছয় সওয়াল:
মানব ইতিহাসের সাথে তুলনা করলে মানব সভ্যতা নতুন
যার সূচনা আনুমানিক পাঁচ হাজার খ্রীস্টপূর্বাব্দে, প্রাচীন মেসোপটোমিয়ায়। একইভাবে, মানব সভ্যতার ইতিহাস বিচারে বিশ্ব
রাজনীতির তুলনামূলক অনেক নুতন যার সূচনা আনুমানিক দুই হাজার খ্রীস্টপূর্বাদে। তবে, রাষ্ট্র কেন্দ্রিক বিশ্ব রাজনীতির সূচনা
হয়েছে আরও অনেক অনেক পড়ে সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে যখন ওয়েস্টফেলিয়ায় সার্বভৌমত্বের ধারণা
প্রতিষ্ঠা পায়। পরবর্তীতে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক
কাঠামোয় অনেক অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে, বিশেষত গত দুই শতকে।
রবার্ট কোহেনের ভাষায়, বিশ্ব রাজনীতির শিক্ষার্থীরা যখন
কোন টপিক বিশ্লেষণ করে তখন তারা রাষ্ট্রকে অপরিবর্তিত হিসেবে ধরে নেয়। তবে, গত দুই শতকে রাষ্ট্রের আচরণে ও কার্যনির্বাহে
যে বিবিধ পরিবর্তন এসেছে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণে সেদিকটা তেমনটা ফুটে ওঠে না। ফলে, এই পরিবর্তন নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম
দেয় তন্মধ্যে ছয়টি প্রশ্নের উত্তর জানার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ব রাজনীতিকে আরও
গভীরভাবে বিশ্লেষণের দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
১. তথ্য-প্রযুক্তির উন্মেষের ধারাবাহিকতায় রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিধান
কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে? (How has politics been affected by the expansion
of force, through technological change, and its dispensation?)
পশ্চিমা বিশ্বে গত কয়েক শতকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ
ও বিবর্তনের প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কেমন পড়েছে নিরূপণে গবেষকরা কাজ করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধে নতুনত্ব এসেছে, বিশেষত
প্রযুক্তির ব্যবহারে, এবং এই প্রযুক্তিগত
উৎকর্ষ ও নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রকে সমরকৌশলে অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে। তবে, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহার
করা যায় না, বিশেষ করে বর্তমানের বিভিন্ন ট্রান্সন্যাশনাল হুমকির
প্রেক্ষাপটে। যেমন: সন্ত্রাসবাদ। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে হয়েছে, অর্থাৎ সফলভাবে টার্গেট ধ্বংস না করতে পেরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সমরাস্ত্র ব্যবহারের
প্রয়োজন পড়েছে। তবে,
ক্ষুদ্র দেশগুলো যাদের সমরাস্ত্র নির্দিষ্ট (যুক্তরাষ্ট্রের
মত অধিক নয়) তাদের প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের উপরই নির্ভর করতে
হয় সমরকৌশলে। অতিরিক্ত সমরাস্ত্র
ব্যবহারের সুযোগ তাদের অল্প থাকে।
২. পুঁজিবাদের পরিবর্তন কীভাবে বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে?
(How has world politics been affected by changes in capitalism?)
পুঁজিবাদের বিকাশে বিশ্ব রাজনীতির প্রকৃতি যে ক্রমেই
পরিবর্তিত হয়েছে তা মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের লেখনী ও জোসেফ স্খুমপটারের তত্ত্বের
আলোকে বোঝা যায়। মার্কস, লেনিন
ও তার অনুসারীরা যুদ্ধকে পুঁজিবাদের ফসল হিসেবে দেখিয়ে থাকেন। তাদের ভাষায় যুদ্ধ নতুন নতুন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি করে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত
পর্যায় পরিবর্তনে প্রচুর বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে, স্খুমপটারের তত্ত্বে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে পুঁজিবাদের ইতিবাচক
ভূমিকার দিককে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে জয়ী- অজেয় হওয়ার তুলনায় পুঁজিবাদের
অনুসরণ যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়ে সমৃদ্ধি ও মুনাফা অর্জনের পথ বাতলে দেয়। তবে মার্কস ও স্খুমপটার উভয়ের লেখনীতেই পুঁজিবাদের পরিবর্তিত রূপকে
নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কারণ প্রাথমিক
পর্যায়ের পুঁজিবাদের ধরণ ক্রমে পালটে বৈশ্বিক শান্তি বা সংঘাতের কারণ হয়ে ওঠে।
৩. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কী কোন গ্রহণযোগ্য উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে?
যদি হয়ে থাকে, তা কী মানব চিন্তার বুদ্ধিবৃত্তিক
বিকাশে হয়েছে? নাকি, মানব চিন্তার আদর্শিক
পরিবর্তনে হয়েছে? (Is there any plausible sense in which progress has
taken place in international relations, and if s, is this progress due to intellectual or moral
advances in human thinking?)
এনলাইটেনমেন্ট যুগের আদর্শিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ
সাধণ ততকালীন চিন্তকদের মাঝে এক ধরণের আশার সঞ্চার করেছিলো যে এবার হয়তো মানুষের কাজ
কর্ম, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ, আদর্শ ও চেতনায় মৌলিক পরিবর্তন আসবে। ফলে দীর্ঘদিনের পশ্চিমের যুদ্ধাংদেহী কালচারের পরিবর্তে শান্তি স্থাপিত হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব অব্দি এই আশাবাদের ব্যাপ্তি ছিলো। দুইটি মহাযুদ্ধ, গণহত্যা, ফ্যাসিবাদের উত্থান, মহামন্দা প্রভৃতি সেই আশাকে হতাশায়
রূপ দেয়। তবে, ১৯৮০ ও
৯০ এর দশকে সে সুপ্ত আশার পুনঃ জাগ্রত হয়। তবে,
আশার এই পুনজাগরণ ঘটে আইডিয়ার ভিত্তিতে, মানুষের
অধিকারের ভিত্তিতে, আন্তর্জাতিক আইনের সংরক্ষণের ভিত্তিতে। ফলে, যুদ্ধ সংঘাত বা সন্তাসবাদের ন্যায় সংকটেও
আদর্শ, শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারের ইতিবাচক আশা টিকে থাকে।
৪. বিশ্বের অধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈচিত্র্য
ও বহুত্ববাদ, এবং জটিল সামাজিক কাঠামো বিন্যাস কী বিশ্ব রাজনীতিকে
প্রভাবিত করে? করলে তা কীভাবে? (What is the impact
on world politics of the increasing diversity and complexity of social
structures in the most powerful societies of the world?)
বিশেষজ্ঞ মহলে একটা কথা চালু আছে যে আধুনিক সমাজ
গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এবং এই সমাজ ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এই জটিলতা সৃষ্টিতে অন্যতম নিয়ামক হিয়ে কাজ করে আধুনিক বিশ্বায়নের
প্রভাব। সরকারের বিভিন্ন অংশীদারদের ভিতরও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। এই অংশীজন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সামাজিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে সরকারের কাঠামোয় বৈচিত্র্য আনছে। এছাড়াও, পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রথাগত লিঙ্গের ধারণা পালটে যাচ্ছে, যা সামাজিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে, এবং এইগুলা একত্রে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এ্যান মেরি স্লটার বলেন বিশ্বায়নের ফলে সামাজিক জটিলতা অনেক বেড়েছে, সামাজিক স্তরভেদ দুর্বল হয়েছে, এবং ব্যাক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে যোগাযোগের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, বিশ্ব রাজনীতির বয়ান বিশ্লেষণে শিক্ষার্থীদের এই পরিবর্তনগুলোকে গভীর থেকে এবং পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
৫. ইলেকট্রনিক নির্ভর প্রযুক্তি, বিশেষত ইন্টারনেট
কীভাবে বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করে? (What are the implications of
electric technologies, especially of the internet, for world politics?)
একটা সময় ছিলো যখন সাধারণ আদর্শ বা ইচ্ছার সাথে বিভিন্ন
স্থানের ব্যক্তি বা দল বা গোষ্ঠীকে পরিচিত করাতে এবং সে আদর্শের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধিতে
পারস্পরিক যোগাযোগের প্রয়োজন পরত। তবে, সে যোগাযোগের
মাধ্যম অতি অল্প থাকায়, যোগাযোগের ক্ষেত্র খুব একটা প্রসারিত
হয়নি। তবে, গত দুই
দশকে ফেলে অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আগমনে সে বাধা ভেঙে পরে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় ঘটে চলা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তিগত বা দলগত বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। ফলে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে- ব্যক্তিগত, দলগত, বা ট্রান্সন্যাশনাল বিভিন্ন পর্যায় থেকে সমন্বিত প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায়, তবে তা হতে পারে ভালোর পক্ষে, বা হতে পারে মন্দের পক্ষে।
৬. মানব সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় প্রশমনে কী ধরণের কার্য-প্রক্রিয়া কার্যকরীভাবে
বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট হবে? (What modes of action can effectively
cope with the unprecedented stress that human beings are imposing on the global
environment?)
প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে এবং একইসাথে ঘটেছে মানব-সৃষ্ট
প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশ দূষণ। যার ফলাফল হল জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের প্রভাব রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। তাই, আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় পরিবেশ সংরক্ষণ, অভিজোযন ও প্রশমণ
প্রভৃতি উদ্দীপকের আলোকে রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হচ্ছে। কাগজে-কলমে জলবায়ু পরিবর্তন হ্রাসে নানা পদক্ষেপ লক্ষিত হয়। রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরকারি ও বেসরকারি
সংস্থার সহায়তাও এই পরিবর্তনের মাত্রা হ্রাসের চেষ্টা চলে। তবে, শিল্পোন্নত দেশের পরিবেশের যে ক্ষতি
করে সে তুলনায় পরিবেশের স্বাভাবিকত্ব বজায়ে অনেক কম প্রণোদনা প্রদান করে। ফলে, আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় একটি নয়া বিতর্কের আবির্ভাব ঘটে।
রবার্ট ও. কোহেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থীদের সামনে এই ছয়টি প্রাথমিক প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা রেখেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের এই প্রশ্নের গভীরতাকে উপলব্ধি করার আহবান জানিয়েছেন। কারণ, গবেষণা থেকে যে আদর্শিক প্রস্তাবের সূচনা ঘটে তাকে বাস্তবিকে রূপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বৈচিত্র্যরূপকে শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে, এবং সে সমীকরণে বিশ্লেষণ করতে হবে। (সংক্্ষেপিত)
ভাবানুবাদক,
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মূল:
Big Questions in the Study of
World Politics by Robert O. Keohane
No comments