থুসিডাইডিসের (Thucydides) এর জীবন কথা
![]() |
| Thucydides |
Thucydides নাম বিশেষ্যটিকে বাংলায় থুচিডাইডিস, থুকাইডিডেস, থুসিডিডেস প্রভৃতি আকারে পাঠকগণ উচ্চারণ করে থাকেন। প্রাচীন গ্রীসের এই মহা সমর কৌশলী তার বিখ্যাত গ্রন্থ History of the Peloponnesian War- এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যায়ণে, বিশেষত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।
থুসিডাইডেস হিস্টোরি অব দ্যা পেলোপনেসিয়ান ওয়ার বইটি যখন লিখতে শুরু করেন তখন গ্রীসের বিভিন্ন ক্ষুদ্র শহর বা সিটি স্টেটগুলো এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। আনুমানিক পঁচিশ থেকে চল্লিশ অব্দি এই পনেরোটি বছরে বিভিন্ন পর্যায়ে থুসিডাইডিস তার গ্রন্থটি রচনা করেন। সে বিবেচনায় ঐতিহাসিকদের ধারণা ৪৭১ খ্রীস্টপূর্ব থেকে ৪৫৫ খ্রীস্টপূর্বের কোন এক অব্দে এই মহান কৌশলী জন্ম লাভ করেন।
থুসিডাইডিসের পিতার নাম ওলোরাস (Olorus)। তিনি এথেন্সের অধিবাসী ছিলেন। এছাড়াও, থ্রেসিয়ান (Thrace) রাজা মিল্টিয়াডেসের (Miltiades) পুত্র সিমোনের (Cimon) সাথে ওলোরাসের সখ্যতা ছিলো। এই সখ্যতার সুযোগে রাজা মিল্টিয়াডেস ওলোরাসকে থ্যাসোস (Thasos) দ্বীপের বিপরীতে থাকা থ্রেসিয়ান নিয়ন্ত্রিত স্বর্ণখনির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োজিত করেন। ফলে, এটা সহজে অনুমেয় হয় যে থুসিডাইডিস জন্মের পরবর্তীতে এথেন্স ও থ্রেসে উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।
ঐতিহাসিকভাবে থুসিডাইডিসের কৈশোর কালের বর্ণনা সেভাবে পাওয়া যায় না। তবে, প্রাচীন জীবনী রচয়িতাদের ভাষায়, থুসিডাইডিস বিখ্যাত আনাক্সাগোরাসের (Anaxagoras) সাথে দর্শন বিষয়ে অধ্যায়ণ করেন, এবং প্রাচীন সাহিত্যিক এন্টিফোনের (Antiphon) সাথে সাহিত্য চর্চা করেন। এন্টিফোনের প্রশংসায় থুসিডাইডিস বলেন, “গোটা এথেন্সে এন্টিফোনের মত ভালো মানুষ খুব কমই আছে।“ তার যৌবনের ন্যায় এথেন্সের যৌবনও খুব উচ্ছল ছিলো এবং এথেন্স সেসময় শক্তিমত্তার চূড়ায় পৌঁছেছে। ফলে, পেরিক্লিসের ন্যায় সমাজের উচ্চস্তরের প্রভাবশালী এথেনীয়দের সাথে থুসিডাইডিসের ওঠা-বসা চলতে থাকে।
৪৩১ খ্রীস্টপূর্বে যখন পেলোপনেসিয়া যুদ্ধ শুরু হয়, থুসিডাইডিস তখন এথেন্সে অবস্থান করছেন। যুদ্ধ শুরুর পরের বছর অর্থাৎ, ৪৩০ খ্রীস্টপূর্বে এথেন্সে প্লেগ মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা। থুসিডাইডিস নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হন। তার লেখা থেকে জানা যায় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে থুসিডাইডিস বলেন, “ প্লেগে আমি নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলাম। তবে, সবচেয়ে কষ্টের ছিলো সাধারণ এথেনীয়দের দুর্দশা দেখে।“ মহামারীর ছয় বছর পরে, অর্থাৎ, ৪২৪ খ্রীস্টপূর্বে, থুসিডাইডিসের জীবনের মোড় পরিবর্তন ঘটে।
পেলোপনেসিয়া যুদ্ধের প্রভাব যাতে এথেন্সের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শহর থ্রেসকে আক্রান্ত করতে না পারে তাই থ্রেসের নিরাপত্তা বিধানে থুসিডাইডিসকে নৌবাহিনীর ও অন্য এক এথেনীয় ইউক্লিসকে পদাতিক সেনাদলের জেনারেল পদমর্যাদা দিয়ে থ্রেসে পাঠানো হয়। থ্রেসের নিরাপত্তা জোরদারে এম্ফিপোলিস (Amphipolis) শহরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এথেন্সের জন্য জরুরি ছিলো। একইভাবে শক্তিশালী স্পার্টান শাসক ব্রাসিডাসের (Brasidas) নিকটও এম্ফিপোলিসের গুরুত্বপূর্ণ ছিলো অত্যাধিক।
থুসিডাইডিসের অধীনে ছিল শক্তিশালী সাতটি যুদ্ধ জাহাজ যা তিনি থ্যাসোস দ্বীপের অর্ধ দিবস দূরত্বে নোঙর করে রাখেন। থুসিডাইডিসের পরিকল্পনা ছিলো থ্যাসোস দ্বীপ থেকে ব্রাসিডাসের সাহায্যে যাওয়া যেকোন সাহায্যকে রুখে দেওয়া, এবং থ্রেসিয়ানদের স্বর্ণখনি থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণের লোভ দেখিয়ে থ্যাসিয়ানদের পেলোপনেসিয়া যুদ্ধে এথেন্সের পক্ষ হয়ে স্পার্টানদের বিপক্ষে লড়ে যাওয়া।
কিন্তু থুসিডাইডিসের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কারণ, এর আগেই থ্যাসিসদের উচ্চবর্গকে ব্রাসিডাস বিরাট অংকের অর্থ ও সম্পদ প্রদানে প্রতিশ্রুতি দেন। এম্ফিপোলিশ শহর দখলে স্পার্টানদের থ্যাসিয়ানরা সাহায্য করে। শত্রুর হাতে এম্ফিপোলিস শহরের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার খবর শোনামাত্র এথেনীয় শাসকবর্গ চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এছাড়াও, তারা থুসিডাইডিসকে জেনারেল পদ থেকে অব্যহতি দেয়, এবং তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
থুসিডাইডিসের নির্বাসন জীবন ছিলো প্রায় বিশ বছরের। তবে, সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ হওয়ায় অন্যান্য সাধারণ এথেনীয়দের ন্যায় থুসিডাইডিসের নির্বাসিত জীবন নির্যাতন, দুর্দশা ও দুশ্চিন্তায় কাটেনি। বরং তার পিতার রেখে যাওয়া বিশাল বিত্তের বদলৌতে এথেন্স ও থ্রেসে তার নির্বাসিত জীবন দারুণই কেটেছে। তিনি তৎকালীন এথেন্সের প্রথা অনুযায়ী উচ্চবিত্ত থাকায় নানা সুবিধা পান, বিশেষত গ্রীসের বিভিন্ন শহরে ভ্রমনের সুযোগ পান। এমনকি তিনি শত্রু শহর স্পার্টায়ও ভ্রমণ করেন।
তার এই দীর্ঘ ভ্রমণের প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের সমাবেশ। এ কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করেছে তার History of the Peloponnesian War গ্রন্থে। তিনি বলেন, “এথেন্সের প্রথা অনুসারে যখন আমাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়, সেই সুযোগটা আমি নেই। আমি এথেন্সের পার্শ্ববর্তী সকল শহরে আমার নির্বাসনের সময়টি কাটিয়েছি আমার গবেষণার দরকারে।“
অবশেষে, নির্বাসিত জীবন শেষে ৪০৪ খ্রীস্টপূর্বে থুসিডাইডিস তার জন্মস্থান এথেন্সে আগমন করেন। এথেন্সের শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন দিক বিবেচনায় থুসিডাইডিসকে নির্বাসন জীবন থেকে মুক্তি দেন। তবে এই মুক্তি বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। মুক্তির কিছুদিন বাদেই এই বিখ্যাত ঐতিহাসিক আততায়ীর হাতে নিহত হন। তাকে হত্যা করা হয় যখন তিনি তার পিতার সম্পত্তি দেখভালের উদ্দেশ্যে থ্রেসে অবস্থান করছিলেন। এবং মৃত্যুর পর তার পিতার সাথে শাসকগোষ্ঠীর সম্পর্কের স্বার্থে থুসিডাইডিসকে এথেনীয় রাজা সিমোনের পারিবারিক সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয়। (সংক্্ষেপিত)
ভাবানুবাদক:
বদিরুজ্জামান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মূল বই:
The History of Herodotus and the History of Peloponnesian War and Thucydides. Page: 345
.jpeg)

No comments