আন্তঃসীমানা নদী আইন (Transboundary River Law): প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধ
আন্তঃসীমানা নদী আইন (Transboundary River Law): প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধ

Farakka Barrage and Bangladesh

ভূমিকাঃ
আন্তঃসীমান্ত
বা অভিন্ন নদী বা Transboundary River হলো এমন একটি নদী যা একাধিক দেশ বা অঞ্চলের সীমা
অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। বিশ্বব্যাপী পানি বন্টন এবং পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও প্রাকৃতিক
পরিবেশের ক্ষেত্রে বরাবরই আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
আসছে।
পানি একটি
অপরিহার্য সম্পদ হওয়ায় এর প্রাপ্যতা সরাসরি একটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং
বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে এই ধরনের অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে
প্রায়ই বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
উদাহরণস্বরূপ,
নীল নদকে নিয়ে মিশর-সুদান ও লিবিয়ার মাঝে বিরোধ, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর পানি
বন্টন নিয়ে চীন-ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে টানাপোড়ন, এবং টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী নিয়ে
ইরাক ও ইরানের মাঝে ঐতিহাসিক বিরোধ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
ইতিহাস এবং পটভূমিঃ
বিভিন্ন
দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও বিরোধের ধারার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার
দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস। তবে সময়ের সাথে সাথে দেশগুলো সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমে পানির
সুষ্ঠ বণ্টন এবং ব্যবস্থাপনার চুক্তি করতেও সক্ষম হয়েছে।
প্রাচীন
যুগ থেকেই বিভিন্ন সভ্যতা নদীর পানি ব্যবহারের জন্য পরস্পর চুক্তি ও সমোঝোতা করে আসছে।
একটা সময় মেসোপটেমিয়া ও মিশরীয় সভ্যতার শাসকরা সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী
ব্যবস্থাপনা করতেন। মধ্যযুগেও নদী সংক্রান্ত বিরোধ ও ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় ছিল। তবে আধুনিক কালে এসে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা আরও সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক
রূপ লাভ করেছে।
ঊনবিংশ
শতাব্দীতে, আন্তর্জাতিক নদীগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। ১৮১৫ সালের ভিয়েনা
সম্মেলন ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর মুক্ত বাণিজ্য ও নৌচলাচল নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি
আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে নদীগুলোর ওপর সমস্ত দেশকে
সমানভাবে বাণিজ্য ও পরিবহনের সুযোগ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো। এরপর ১৮৮৫ সালে, বার্লিন
কনফারেন্সে আফ্রিকার নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ে আলোচনা হয়, বিশেষ করে কঙ্গো নদী নিয়ে,
যা কলোনিয়াল দেশগুলোর জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিংশ শতাব্দীর
শুরু থেকে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯০৯
সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাউন্ডারি ওয়াটারস ট্রিটি স্বাক্ষরিত হয়, যা জলসীমান্ত
নিয়ে বিরোধ নিরসনে সহায়ক ছিল। ১৯২৯ সালে মিশর ও সুদানের মধ্যে নীল নদ নিয়ে প্রথম
চুক্তি হয়, যা পরবর্তীতে আরও কয়েকটি চুক্তির ভিত্তি তৈরি করে।
দক্ষিণ
এশিয়ায়, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে সিন্ধু নদী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা
আন্তর্জাতিক পানি চুক্তির অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের Convention
on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses গৃহীত
হয়, যা আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক নিয়ম নির্ধারণ করে।
এ সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মূলনীতিঃ
আন্তর্জাতিক
আইনে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি রয়েছে যা নদীর পানি বণ্টন
এবং পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশগুলোর অধিকার ও মৌলিক দায়িত্ব নির্ধারণ করে।
এই মূলনীতিগুলো
মূলত আন্তর্জাতিক পানি আইন ও চুক্তি প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। উক্ত নীতিগুলো
হলোঃ
১. অভ্যন্তরীণ
সার্বভৌমত্বঃ প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব ভূখণ্ডের মধ্যে প্রবাহিত নদী ও জলস্রোতের উপর
পূর্ণ সার্বভৌমত্বের অধিকার রাখে। দেশগুলো তাদের সীমানার মধ্যে নদীর পানি কীভাবে ব্যবহার
করবে তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে পারে। তবে এই সার্বভৌমত্বের অধিকার অন্য দেশগুলোর
অধিকারে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার শর্তে প্রযোজ্য, বিশেষত যখন নদীটি একাধিক দেশ অতিক্রম
করে।
২. সমতার
নীতিঃ এই নীতি
অনুযায়ী, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির বণ্টনে প্রতিটি দেশের সমান অধিকার থাকতে হবে। কোনো
দেশই একতরফাভাবে পুরো পানির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। প্রতিটি দেশকে ন্যায়সংগত
ও যৌক্তিকভাবে পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অন্য দেশগুলোর প্রয়োজন বা স্বার্থ
ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
৩. জনস্বার্থ
ও পরিবেশ সংরক্ষণঃ
আন্তর্জাতিক
আইনের এই নীতি অনুযায়ী, নদী ব্যবস্থাপনায় শুধু দেশের উন্নয়ন নয়, স্থানীয় জনস্বার্থ
ও পরিবেশ সংরক্ষণও গুরুত্ব পায়। নদীর পানি ব্যবহারে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, বাস্তুসংস্থান
এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিবেশগত
ক্ষতি এড়ানো যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানি সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
৪. অপরিবর্তনীয়
ক্ষতির নীতিঃ কোনো দেশ নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এমন কিছু করতে পারবে না যা অন্য
দেশের পরিবেশ বা জলসম্পদকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই নীতির অধীনে, নদীর পানি
ব্যবহারে দূষণ বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য হ্রাসের মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ
আন্তঃসীমানা
নদী আইন মূলত এমন একটি আইনি কাঠামো, যা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বহমান নদীর পানি ব্যবস্থাপনা
ও বণ্টন নিয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিয়মাবলী প্রণয়ন করে। পৃথিবীতে প্রায় ২৬৩টি আন্তঃসীমানা
নদী প্রবাহিত, যা ১৪০টি দেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে এবং প্রায় ৪০% মানুষের জীবিকা নির্ভর
করে এই নদীগুলোর উপর।
আন্তঃসীমান্ত
নদীগুলোর পানির ন্যায্য বণ্টন, ব্যবহার এবং সংরক্ষণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নানামুখী
চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, তাত্ত্বিক ভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়ঃ
১. সার্বভৌমত্ব
বনাম আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতাঃ
প্রতিটি
দেশ তার নিজস্ব সীমানার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ অধিকার রাখে। এই তত্ত্ব
অনুসারে, নদী যে দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেই দেশ নদীর পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
ও ব্যবহার করার অধিকারী। দেশগুলো সাধারণত এই অধিকারকে নিজের পক্ষে টেনে নিলেও, বাস্তবে
নদী একক দেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না।
কারণ নদীর
অবিচ্ছেদ্য সংযোগপূর্ণ গতি। অন্যদিকে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবহারের জন্য দেশগুলোর মধ্যে
সহযোগিতা অপরিহার্য। এই তত্ত্ব অনুসারে, একাধিক দেশ যখন একই নদী ব্যবহার করে, তখন তাদের
মাঝে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার প্রয়োজন পরে। এক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব সহযোগিতার মাঝে সংঘর্ষ
হিসেবে দেখা দিতে পারে।
২. জলবায়ু
পরিবর্তনঃ
জলবায়ু
পরিবর্তন আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর উপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
এবং আইন ব্যবস্থার জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি প্রবাহ জলবায়ু
পরিবর্তনের কারণে অস্থির হয়ে পড়ছে।
দুই মেরুর
বরফ গলে যাওয়া, অনিয়মিত বা মাত্রাধিক বৃষ্টিপাত, এবং বন্যা ও খরার মতো চরম আবহাওয়াজনিত
ঘটনা নদীগুলোর পানির স্তরে নাটকীয় পরিবর্তন আনছে। এতে নদী তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে
পানির বণ্টন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ বাড়তে পারে।
কেস স্টাডিঃ ফারাক্কা সংকট
ফারাক্কা
সংকট হলো ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ এবং গঙ্গা নদীর পানির একতরফাভাবে প্রত্যাহারের
কারণে বাংলাদেশের উপর সৃষ্ট একটি গুরুতর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সমস্যা। ফারাক্কা বাঁধের
মাধ্যমে গঙ্গার পানি হুগলী নদীর নাব্যতা রক্ষার উদ্দেশ্যে সরানো হয়, কিন্তু এতে বাংলাদেশের
উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, নদীর নাব্যতা, মাটির উর্বরতা, এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে।
বিশেষত,
ফসলের মৌসুমে সেচের পানির অভাব, বন্যার আশঙ্কা, এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের বড়সড়
ক্ষতি প্রভৃতি ফারাক্কা বাঁধের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এই সংকটকে মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ
বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন
নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সম্পাদিত হয়।
ফারাক্কা চুক্তি ১৯৯৬ এর বৈশিষ্ট্যঃ
1. ফারাক্কা পয়েন্টে পানি বিতরণঃ ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে বাংলাদেশকে পানি সরবরাহ করবে।2. পানি বণ্টন সময়সীমাঃ প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত প্রতি দশ দিনে পানি বণ্টন হবে।
3. ৭০ হাজার কিউসেকের কম পানি হলেঃ উভয় দেশ সমান পরিমাণে পানি পাবে।
4. ৭০-৭৫ হাজার কিউসেক সম পরিমাণ পানি হলেঃ বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পাবে এবং বাকিটা ভারত পাবে।
5. ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি পানি হলেঃ ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পাবে, এবং বাকিটা বাংলাদেশ পাবে।
6. এপ্রিল মাসের পানি বণ্টনঃ পূর্ববর্তী ৪০ বছরের গড় প্রবাহের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এপ্রিলের প্রথম ও শেষ দশদিন ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ১১-২০ এপ্রিলের মধ্যে ২৭,৬৩৩ কিউসেক পানি পাবে।
7. ৫০ হাজার কিউসেকের কম হলেঃ পানি প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে চলে গেলে উভয় দেশ আলোচনা করবে।
8. ভাটিতে পানির ন্যূনতম প্রবাহঃ ফারাক্কার ভাটিতে পানির পরিমাণ বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত পানির ৯০% এর কম হবে না।
10. যৌথ কমিটিঃ ফারাক্কা ও হাডিঞ্জ ব্রিজে পানি প্রবাহ ও নাব্যতা পর্যবেক্ষণে যৌথ কমিটি গঠন করা হবে।
11. বার্ষিক রিপোর্টঃ যৌথ কমিটি পানি প্রবাহ সম্পর্কিত উপাত্ত সংগ্রহ করে উভয় সরকারের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট জমা দেবে।
ক. অংশীদারিত্বঃ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত
যৌথভাবে গঙ্গার পানি ব্যবহারের জন্য একটি আইনি ভিত্তি পেয়েছে, যা দেশের পানির সম্পদের
উপর নির্ভরতা কমিয়েছে।
খ. বণ্টন
কৌশলঃ চুক্তি
অনুযায়ী, ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়, বিশেষ
করে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যা দেশের কৃষি ও পানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গ. খরা
ও বন্যা নিরসনঃ চুক্তি গঙ্গার খরা ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে,
কিন্তু বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
ঘ. মনিটরিং
ও সমস্যা সমাধানঃ চুক্তিতে পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে,
যা সমস্যাগুলি নিরসনে সহায়তা করে, কিন্তু এই মনিটরিং সিস্টেমের কার্যকারিতা মাঝে মাঝে
প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ফারাক্কা সংকটঃ
চুক্তি
অনুযায়ী, গঙ্গা নদীর পানি দুই দেশের মধ্যে যথাযথ পরিমাণে বা ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভাগাভাগি
করার কথা থাকলেও বাস্তবে, চুক্তি মেনে চলা হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের পক্ষ
থেকে অভিযোগ উঠেছে। উক্ত অভিযোগের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে প্রধান কারণগুলো
হলোঃ
১. ভারতের
অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনাঃ ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা গঙ্গা নদীর
প্রবাহকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে যা বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতাকে দিন দিন সীমিত করে
তুলেছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরাখণ্ডের সেচ ব্যবস্থার অধিকাংশই
গঙ্গা নদীর পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের পানি চাহিদা
পূরণ করার জন্য গঙ্গার পানিপ্রবাহ অনেকাংশে ভারতের অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যয় হয়ে যায়।
এছাড়া ভারতের
বিভিন্ন বড় শহর, যেমন কানপুর, বারাণসী, পাটনা, এবং কলকাতা, গঙ্গার পানি সরাসরি ব্যবহারের
মাধ্যমে শিল্প ও নগরায়ণ বৃদ্ধি করে চলেছে। ফলে শহরগুলোতে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে
কিন্তু অন্যদিকে গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং পানির গুণগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।
শিল্প ও নগরায়ণের কাজ ছাড়াও ভারতের হাইড্রোইলেকট্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গঙ্গার পানি ব্যবহৃত
হয়, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. আন্তর্জাতিক
আইন ও চুক্তি বাস্তবায়নে দুর্বলতাঃ গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে
বাধ্যতামূলক কোনো কাঠামো নেই। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি মূলত দ্বিপাক্ষিক
চুক্তি, যা আন্তর্জাতিক জলবন্টন আইন বা সংস্থার অধীনে কঠোরভাবে বাস্তবায়িত নয়। ফলে,
কোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে তাকে চাপ দেওয়ার আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর পদ্ধতি নেই।
তবে গঙ্গা
পানি বণ্টন চুক্তিতে একটি যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে বণ্টনের তদারকি করার ব্যবস্থা থাকলেও,
বাস্তবে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় হয় না। কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে তা
দ্রুত সমাধানের জন্য কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই।
৩. রাজনৈতিক
ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জঃ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগাভাগির ইস্যুতে রাজনৈতিক
সংবেদনশীলতা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভারত এই ধরনের ইস্যুকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক
ইস্যুতে পরিণত করে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে, যা বাংলাদেশ-ভারত
সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। তাছাড়া, দুই দেশের মধ্যে পর্যাপ্ত কূটনৈতিক আলোচনা ও সমন্বয়
প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।
উল্লেখিত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান না হলে “গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তি”-র মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত, বাংলাদেশের গঙ্গার পানি প্রাপ্তি অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে।
তথ্যসূত্রঃ
১.সমকালীন
আন্তর্জাতিক আইন (দ্বিতীয় সংস্করণ)- ড. এম. শাহ আলম
২. আন্তর্জাতিক
আইন- অধ্যক্ষ মোঃ আলতাফ হোসেন
লিখেছেন-
শমরিতা
বড়ুয়া
আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়

No comments