Track I Diplomacy: রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কূটনীতি
Track I Diplomacy:
“ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসি” প্রত্যয়টি দিয়ে সরকারি (অফিশিয়াল) কূটনীতিকে বুঝায়। সরকারি (অফিসিয়াল) কূটনীতি হলো এমন এক ধরনের কূটনৈতিক কার্যক্রম, যা উভয় রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একে অন্যের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। উল্লেখ্য, যেমন এক হাতে তালি বাজে না, দু'হাতের প্রয়োজন পরে। তেমনি কূটনৈতিক তৎপরতা একা একা চলে না, বস্তুত, দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক কার্যক্রম সম্পাদিত হয়।
Track I কূটনীতিতে একটি রাষ্ট্রের সরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বা সরকার নির্ধারিত ব্যক্তিরা অন্য রাষ্ট্রের সরকারি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি বা নির্ধারিত ব্যক্তির যেমন: রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সচিব, বিশেষত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রভৃতির সাথে যোগাযোগ, আলাপ-আলোচনা ও নেগোশিয়েশনে অংশ নেয়।Track I কূটনীতিকে অনেকে “ফার্স্ট ট্র্যাক বা প্রথম সারির” অথবা “ফার্স্ট টায়ার বা প্রথম স্তরের কূটনীতি” বলেও সম্বোধন করে থাকেন। এ ধরনের কূটনৈতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে সহজে Track I কূটনীতিকে- অন্যধরনের (বে-সরকারি) কূটনীতি থেকে আলাদা করা যায়।
যেমন: সংকট/ সংঘাত সমাধানে যখন রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল কূটনীতি ব্যর্থ হয়, অথবা সামগ্রিকভাবে সংকট/ সংঘাত সমাধানে সচেষ্ট হয়ে ওঠে না, তখন সরকারি তৎপরতার পাশাপাশি বিভিন্ন বে-সরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ, এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও সে কূটনৈতিক কার্যক্রমের অংশ নিতে দেখা যায়। আধুনিক কূটনীতির ভাষায়, এহেন কূটনৈতিক তৎপরতাকে দ্বিতীয় সারির কূটনীতি বা Track II Diplomacy বলা হয়।
Track I কূটনীতি দুই রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে হতে পারে (যেমন: বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা নদী পানি বন্টন চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে দু'দেশের সরকারি লেভেলে অনেকবার কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে), অথবা দুইয়ের অধিক বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে হতে পারে (যেমন: পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে করা NPT চুক্তির ক্ষেত্রে দুয়ের অধিক রাষ্ট্র সরকারি পর্যায়ে কূটনীতি পরিচালনা করেছে এবং অনেকেই সে চুক্তকে রেটিফাই বা সম্মত ই দিয়েছে), অথবা আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক পর্যায়ে সৃষ্ট হওয়া বিভিন্ন আন্ত:সরকারি সংস্থার (IGO) মাধ্যমেও হতে পারে (যেমন: ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের সমাধানকল্পে সমুদ্র বিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালত: ITLOS (International Tribunal for the Law of the Sea) ও PCA (Permanent Court of Arbitration) এর মাধ্যমে এই তিন দেশের মাঝে কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ করা যায়। যার ফলাফল হিসেবে প্রায় এক লক্ষ আঠারো হাজার নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যুক্ত হয়।
Track I কূটনীতির উদ্দেশ্য:
অথবা, কূটনৈতিক তৎপরতা অনুসারে প্রথম ধারার কূটনীতির উদ্দেশ্য হতে পারে বিভিন্ন উপায়ে রাষ্ট্র-ক, রাষ্ট্র-খকে প্ররোচিত করে তার কুটনৈতিক স্বার্থ হাসিল করবে, যাকে কূটনীতির ভাষায় বলে Persuasion। এক্ষেত্রে, আলাপ আলোচনা, একে অন্যের স্বার্থে ছাড় দেওয়া (Win Win Approach), বা রাষ্ট্র-ক এর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে রাষ্ট্র-ক, রাষ্ট্র-খকে প্ররোচিত করতে পারে।
এছাড়াও, Track I কূটনীতির অন্যতম সুবিধা এর মাধ্যমে উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্কের মাঝে চলা টানাপোড়ন কাটিয়ে ওঠা বা উলটো করে বললে উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ত্বরান্বিত করা যায়। প্রথম স্তরের কূটনীতির সাহায্যে রাষ্ট্রের মাঝে অমীমাংসিত কোন বিষয়ে পারস্পরিক সম্মতি লাভের সুযোগ তৈরি হয়। এ সম্মতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ অন্যথায় সংঘাত বা সংকট স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
কিছু সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা সফল হয়ে ওঠে না, কারণ সংঘাত সৃষ্টির প্রধান কারণের সাথে রাষ্ট্রদ্বয়ের স্বার্থের যোগসূত্র থাকে। সে ক্ষেত্রে Track I কূটনীতিতে প্রথমে নেগোশিয়েশন, পরে অফিশিয়াল আলোচনাপর্ব সম্পাদনা করে। কিন্তু যখন এই পদ্ধতিগুলো কাজ করে না তখন তৃতীয় একটি রাষ্ট্রকে আহবান জানানো হয় যে উভয়ের মাঝে মধ্যস্থতাকারী (Mediator) হিসেবে কাজ করবে। এই মধ্যস্থতাকারীও উভয়ের মাঝে সংকট সমাধানে Track I কূটনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অর্থাৎ উভয় রাষ্ট্রের সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
Track I কূটনীতি যেভাবে পরিচালিত হয়:
নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রে, একটি রাষ্ট্র কোন লেভেলের সরকারি প্রতিনিধি অন্য রাষ্ট্রে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাচ্ছে তা দেখে ঐ রাষ্ট্রের কাছে নেগোসিয়েশনের গুরুত্ব কতটুকু তা অনুধাবন করা যায়। যখন কোন রাষ্ট্র নেগোসিয়েশনে নিম্নপদস্থ প্রতিনিধির প্রেরণর পরেও ধারাবাহিকতা বঝায় রেখে উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি প্রেরণ করে তখন নেগোসিয়েশনের প্রতি ঐ রাষ্ট্র কতটা আগ্রহী বা সংকল্পবদ্ধ তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
নেগোসিয়েশনের প্রতিটি পর্যায়ে কিছু প্রথাগত বিষয় অনুসরণ করা হয়। যেমন: অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করা, প্রতিনিধিবৃন্দের পারস্পরিক ফর্মাল সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতা, এবং সাধারণ কথাবার্তা ও সৌজন্য প্রকাশ।
অনেকক্ষেত্রে সৌজন্য সাক্ষাৎকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে কোন চুক্তি বা সনদ বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। যদি রাষ্ট্র পরবর্তীতে চুক্তিতে উপনীত হতে চায়, তবে সে সমঝোতা স্মারককে খসড়া বিবেচনাপূর্বক উভয় দেশের কূটনীতিকদের মাঝে আলাপ আলোচনা হয়, এবং চুক্তি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে খসড়াকে চুক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়।
তবে, এমন আলোচনা যদি বহুপাক্ষিক পরিসরে হয়ে থাকে, তখন সম্মেলন বা সামিটের সাইড লাইনে আলোচনার বিরতিতে রাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা করতে পারে। যেমন: সাধারনত, প্রতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের সময় বাংলাদেশ- ভারত, চীনসহ আরও কিছু দেশের সাথে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কূটনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
Track I কূটনীতি কত ধরণের হয়?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ ও লেখা বিশ্লেষণ করলে কয়েক প্রকারের Track I কূটনীতির সন্ধান মেলে।এক্ষেত্রে The Institute of World Affairs (IWF) থেকে আমরা সাহায্য নিতে পারি। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাত ধরণের প্রথম সারির কূটনীতির কথা উল্লেখ করে। যথাঃ
১. সাধারণ পরামর্শ প্রদান (Informal Consultation) ট্র্যাক ওয়ান কূটনীতির একটি অনানুষ্ঠানিক রূপ। অর্থাৎ, এখানে উভয় রাষ্ট্রের মাঝে সংকট বা সংঘাত সৃষ্টিতে যে সকল অংশীদার জড়িত বা যে সকল অংশীদার সে সংঘাতে প্রভাবিত হন তাদের মাঝে সাধারণ (Casual) আলোচনা বা পরামর্শ আদান-প্রদান চলে।
এক্ষেত্রে কোন সরাকারি বাধ্যবাধতা বা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয় না। এ ধরণের আলোচনার সাহায্যে উভয়ের মধ্যে বিশ্বাসের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়; সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়; সাধারণ আলোচনা ফলপ্রসূ হলে সরকারি লেভেল থেকে কূটনৈতিক কার্যক্রম সূচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়; এবং যদি কোন ভুল বুঝাবুঝি থেকে সম্পর্কে সংকট তৈরি হয়ে থাকে তা সহজে প্রশমন করা সম্ভব হয় ইত্যাদি।
২. প্রথম ধারার কূটনীতিতে সুপারিশ প্রদানকারী দপ্তর (Good Offices) বলতে তৃতীয় পক্ষকে বুঝানো হয়। এই তৃতীয় পক্ষ বস্তুত একটি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা, যে দুটি রাষ্ট্রের মাঝে চলমান সংকট বা সংঘাত সমাধানে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। যেমনঃ ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরীতার প্রেক্ষাপটে চীন উভয়ের মাঝে কূটনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে।
কূটনৈতিক সহযোগী হিসেবে তৃতীয়পক্ষ নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে যায়। আবার রাষ্ট্রের পাশাপাশি কোন কোন প্রেক্ষাপটে আন্তঃসরকারি সংস্থা অথবা সরকারি কোন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি তৃতীয়পক্ষ হিসেবে কূটনৈতিক সুপারিশ প্রদান করে থাকে।
যেমনঃ কফি আনানকে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সার্বিক বিষয়ে পর্যাবেক্ষণ করতে জাতিসংঘ তার সাবেক প্রধান কফি আনানকে বিশেষ দূত হিসেবে মিয়ানমারে পাঠায়। বস্তুত, এই কমিশনের কাজ ছিলো নির্দিষ্ট: রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া, এবং একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে সঠিক চিত্র তুলে ধরা। দায়িত্ব শেষে, আনান কমিশন গঠন করে রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যপারে তদন্তের দাবী ওঠে।
স্বাভাবিকভাবে, মধ্যস্থাকারী ব্যক্তি বা সংস্থা বা দেশ সংঘাতের বিষয়ে অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ থাকে। তৃতীয়পক্ষ সংঘাতময় পক্ষের নিকট প্রথমে একটি বা একাধিক উপায় সুপারিশ করেন। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে সুপারিশ গৃহীত হয় না কারণ এই সুপারিশ গ্রহণে কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না। চাইলেই যেকোন এক পক্ষ নিরপেক্ষ সুপারিশকারীর সুপারিশকে অস্বীকার করতে পারে।
বেশিরভাগ নেগোশিয়েশনে একটি কাঠামো মেনে আলোচনা করা হয়। আলোচনার বিষয়বস্তু, সরকারি প্রটোকল এবং আলোচনার উদ্দেশ্য প্রভৃতি নেগোশিয়েশন কাঠামোর অংশ। এবাদেও, নেগোশিয়েশন হয় সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে। সামনা সামনি বসে উভয় পক্ষ তাদের আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। এই আলাপচারিতায় উভয়ের স্বার্থের প্রসঙ্গটি উল্লেখিত হয়। নেগোশিয়েশনের অন্যতম লক্ষ বা উদ্দেশ্য থাকে উভয়ের স্বার্থ বিবেচনায় কোন চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা।
এ নিন্দা রাষ্ট্র বা সংস্থা দাপ্তরিক আকারে জানাতে পারে (যেমনঃ ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারিভাবে নিন্দা প্রকাশ করেছে), বা লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের উপর কূটনীতিক চাপ তৈরি করতে পারে (যেমনঃ ইরানের পারমাণবিক শক্তিকে অস্ত্রে রূপান্তর থেকে রুখতে পশ্চিমা কূটনৈতিক চাপ প্রদান, অথবা সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমনঃ ১৯৯০ সালে কুয়েত দখলের প্রেক্ষাপটে ইরাকের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।


No comments