Header Ads

Header ADS

অস্ত্র প্রতিযোগিতা (Arms Race) কীভাবে যুদ্ধকে উস্কে দেয়?



US-Soviet Arms Race

দুই বা ততোধিক রাষ্ট্র একে অন্যকে টক্কর দিতে বা পারস্পরিক শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখতে যে উপায়ে সামরিক স্থাপনা তৈরি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তাকে Arms Race বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বলে অর্থাৎ অস্ত্র প্রতিযোগিতা ধারণাটি দ্বারা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার যে কোন সামরিক সক্ষমতা তৈরি ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিযোগিতাকেই বুঝায় অর্থাৎ, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বিরাজ করবে এবং প্রতিযোগিতাটি  উভয়ের খারাপ বা শত্রুতাভাবাপন্ন সম্পর্কেরই ফল

 অস্ত্র প্রতিযোগিতার কিছু দৃষ্টান্তঃ

একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জার্মানি ও বৃটেনের মধ্যকার ‘Dreadnought’ নামক অতি আধুনিক যুদ্ধ জাহাজ তৈরির প্রতিযোগিতা বিংশ শতকের শুরুতেই জার্মানি উদীয়মান শক্তির দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের শক্তিশালী নৌ-বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে এবং অনেক যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করে ফলে যুক্তরাজ্য নিজেকে কোনঠাসা মনে করে ১৯০৬ সালে যুক্তরাজ্য তার নৌ-বাহিনীতে অতি-আধুনিক যুদ্ধজাহাজ HMS Dreadnought কে যুক্ত করে যা জার্মানি ও বৃটেনের মধ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে তরান্বিত করে

১৯০৯-১৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্য ১৯টি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও  ৯ টি দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ তার নৌ-বাহিনীতে যুক্ত করে অন্যদিকে, জার্মানি ১৩ টি ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজ ও ৫ টি দ্রুতগতির যুদ্ধ জাহাজ তাদের নৌশালায় যোগ করে বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলেন যে বৃটেন ও জার্মানির মধ্যকার এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল

বিংশ শতকে, স্নায়ুযুদ্ধ কালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমানবিক শক্তি তৈরি প্রতিযোগিতা অস্ত্র প্রতিযোগিতার আরএকটি বড় উদাহরণদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেকেও পারমানবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে  দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়এই প্রতিজ্ঞা থেকেই দুই সুপার পাওয়ারের মধ্যে অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়প্রতিযোগিতা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে তাদের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায় 

১৯৫৬ সাল নাগান এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র এই অল্প সময়ে প্রায় ২১২৩ টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করেএবং সোভিয়েত ইউনিয়ন করেছে মাত্র ৮৪ টিকিন্তু পরবর্তী ৩০ বছরে সোভিয়েত ইউনিয়ন  যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অস্ত্র তৈরি প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে থাকে ১৯৮৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারহেড বা টর্পেডো ছিলো প্রায় ১৩ হাজার, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ ছিলো ১১,৩২০ টি (তথ্যটি স্টকহোম আন্তর্জাতিক পিচ রিচার্স ইনস্টিটিউট থেকে নেওয়া হয়েছে) স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ইতি টেনেছিলো

অস্ত্র প্রতিযোগিতায় একে অন্যের থেকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে তীক্ষ্ণ করার প্রতিযোগিতায় নামে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়কিন্তু এই ব্যয় সবসময়ই যে সামরিক দক্ষতার উৎকর্ষ ঘটাবে তা সঠিক নয়

অন্যদিকে, এই প্রতিযোগিতার প্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করে দেশগুলোর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থবাদী মনোভাবের উপর রাষ্ট্রীয় পলিসি অনুযায়ী একে অন্যের শত্রুতা দীর্ঘায়িত হয়, বিশেষ করে চরম উত্তেজক মূহুর্তে অস্ত্র প্রতিযোগিতা তরান্বিত হয় ভারত-পাকিস্তান, ইজ্রায়েল-আরব দেশগুলো, গ্রীস- তুর্কী এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আর্মেনিয়া-আজারবাইজান ইত্যাদি একে অন্যকে নিজেদের প্রধান শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে- দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে যার ফলাফল- অস্ত্র প্রতিযোগিতা।।

অস্ত্র প্রতিযোগিতার ফলাফলঃ  

অস্ত্র প্রতিযোগিতা সবসময়ই সকল দেশের অর্থনীতি ও সার্বিক নিরাপত্তার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেবৃহৎ পরিসরে অস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিরাট পরিমাণের আর্থিক সক্ষমতার প্রয়োজন পড়েযদি দুটি দেশ একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে অস্ত্র উৎপাদন করে এবং এই ধারা অব্যাহত রাখে- সেক্ষেত্রে বিশাল অংকের অর্থের অপচয় ঘটে কারণবৃহৎ অস্ত্রগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বেচা-কেনা নিষিদ্ধ। তাই এই বৃহৎ অস্ত্র থেকে কোন লাভই আসে না। 

এই পয়েন্ট ধরেই বিতর্ক শুরু হয় কেউ বলে এই অস্ত্র উৎপাদনে প্রযুক্তির বিকাশ হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেকিন্তু অপরপক্ষের মতে, এই যে বিশাল অংকের বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার তুলনায় খুব কম মুনাফা অর্জন হয় নিঃসন্দেহে দেশগুলো যত বেশি অস্ত্র আমদানি করবে, তত অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা বাড়বে, এবং দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় পচন ধরবে ৩য় বিশ্বের বেশীরভাগ দেশই ঋণে জর্জরিত এবং এই ঋণের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তাদের অস্ত্র আমদানি

এমনকি, অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোও সবধরনের অস্ত্র রপ্তানি করতে পারে না, যা তাদের অর্থনীতিতে ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি করে উদাহরণ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেমে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা একদম নাজুক হয়ে পড়ে ফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষ, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি ইত্যাদির প্রভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এই পতন অস্ত্র প্রতিযোগিতার নেতিবাচক প্রভাবের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

অর্থনীতির পরে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কীভাবে যুদ্ধ বা সংঘাতের প্রধান কারণ? – এই প্রশ্ন নিয়েও বিতর্ক দেখা যায় আসলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুদ্ধ শুরু করে কী করে না- এই প্রশ্নোত্তরের আগে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা দেশগুলোর মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করেএছাড়াও, ঐতিহাসিক ও অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে বলা যায় যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুদ্ধের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়- কিন্তু একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে এই প্রতিযোগিতাই যুদ্ধের একমাত্র কারণ(সংক্ষেপিত)

 

অনুবাদকঃ বদিরুজ্জামান

মূলঃ Sam Perlo- Freeman

Stockholm International Peace Research Institute, Sweden.  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


 

No comments

Theme images by rajareddychadive. Powered by Blogger.